Stories

চোখ -


কে এই রমণী? —নর্তকী, বাররামা, বিদুষী। নগরীর সমস্ত পুরুষ অগ্নিলুব্ধ পতঙ্গের মতো ধাবমান। রাজপুরুষেরা, বাগ্মী, কবি, চিত্রকর, ভাস্কর ও দার্শনিকেরা। গৃহবধূ ও প্রণয়িনীরা হয়ে উঠেছে শঙ্কিত, এমনকি অন্য বাররামরাও।

গোধূলি সমাগত হতে-না-হতে চঞ্চলার গৃহে পুরুষেরা সমবেত হতে থাকে। সকলেই তার প্রণয়প্রার্থী, সকলেই তার কৃপাভিখারী। আর চঞ্চলার জন্মগ্রহণ গ্রামে হলেও নগরীতে যখন সে নীত হয়েছে তখন তাকে মনে হয় এক আশ্চর্য মৃণালে উদ্যত পঙ্কজের মতো। তার মুখের মণ্ডলে যেন বিলুপ্ত কোনো প্রাচীন নগরীর কারুকার্য খচিত; তার কেশদাম যেন নিশীথের অন্ধকারের দ্বারা রচিত; গাত্ৰবৰ্ণ কনকাভ : দেহ দীঘল ও তণ্বী; স্তন নিটোল, পরিপূর্ণ ও কোমল-কঠিন দুটি ফলের মতো; শ্রোণী নিবিড়, পরিপূর্ণ ও কোমল-কঠিন দুটি ফলের মতো; করাঙ্গুলি সদ্যজাত অগ্নিশিখ পর্বতের মতো; পদাঙ্গুলি রক্তশিখ সদ্যজাত পল্লবের মতো। চঞ্চলা এক শারীরিণী রমণী; কিন্তু শরীরসর্বস্ব নয়—তার হাস্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মেধার দ্যুতি; হয়তো গভীর নয় কিন্তু চারু তার বাচনভঙ্গি; কবিতা ও ভাস্কৰ্য, চিত্ৰকলা ও দর্শন-সমেত সব বিষয় সম্পর্কেই আছে তার প্রাথমিক জ্ঞান। সেজন্যে তার সঙ্গে আলাপের আবহ থাকে সচ্ছল বাতাসের মতো। আর সে, বাররামা, জানে বাক্যের সঙ্গে কি করে মেশাতে হয় কটাক্ষ, হর্ষের উদ্বেলতার সঙ্গে কি করে সংগত হয় নিতম্বের হিল্লোল। তার শরীর যেন একটি সংগীত; যেন একটি সোনালি পানপত্রের উত্থাপন; আর তার রতিকুশলতা বাদ্য-যন্ত্ৰে মৃদু-সমতল-তীব্ৰ-অতিতীব্র এইমতো ক্ৰমোচ্চলীলা সুদক্ষ করাঙ্গুলির!


চঞ্চলা একটু স্বতন্ত্র। সাধারণ স্নানাগারে সে কখনো যায় না, কেমন যেন তার রুচি হয় না সাধারণ্যে নগ্ন হতে। চঞ্চলার খ্যাতি ও পুরুষমহলে প্রতিপত্তি ও আকর্ষণ হয়তো এত বেশি এজন্য যে বাররমণী হলেও তাকে সাধারণ্যে নগ্ন দেখা যায় না। বছরে একবারই, নগরীর বাৎসরিক উৎসবে মন্দিরে প্রণতি সমাপন করে সে আমূল নগ্ন হয়ে সমুদ্রে স্নান করতে যায়। বৎসরে ঐ একবারই তাকে নগরবাসী নগ্ন দেখতে পায়। কিন্তু উৎসবের উন্মাদনায় সবাই এত ব্যস্ত থাকে তখন যে, নগ্নিকা চঞ্চলার দিকে আলাদা দৃষ্টিপাতের অবসর থাকে না করো। কেবল হাজার হাজার নরনারীর ভিতরে লুকিয়ে এক রাজপুরুষ পৃথিবীর তীব্রতম ক্ষুধা নিয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। রাজপুরুষ চঞ্চলার এক প্রত্যাখ্যাত প্রেমিক। গত তিন বছরে সে এই উৎসবের দিনটিতে চঞ্চলাকে দেখার জন্যে ভিড়ের ভিতরে লুকিয়ে তাকে। তারপর স্থালী হাতে আমূল নগ্ন চঞ্চলা যখন মন্দিরদ্বার থেকে বহির্গত হয়ে একটি দীপ্র ঘোটকীর মতো সমুদ্রের উদ্দেশে চলতে থাকে, তখন জনতার মধ্যে থেকে তাকে অনুসরণ করে এক রাজপুরুষ। তাকে সমুদ্র অবধি অনুসরণ করে রাজপুরুষ, নীল সিন্ধুজলে রূপসীর অবতরণ অবধি, এবং তারও পর তার স্নান সমাপন অবধি তার ক্ষুৎকাতর চক্ষুদ্বয় জ্বলন্ত জাগ্রত থাকে। এই রাজপুরুষ দীর্ঘাঙ্গ ও সুদৰ্শন। অথচ কত তুচ্ছ নাগরিক চঞ্চলার হৃদয় ও শরীরের দখল পেয়েছে, কিন্তু এই রাজপুরুষকে চঞ্চলা কি-এক অজ্ঞাত কারণে প্রত্যাখ্যানের পর প্রত্যাখ্যান করেছে। কতদিন চঞ্চলাকে এক-পলক দেখার আশায় তার বাড়িতে গিয়ে বসে থেকেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কিন্তু আশ্চর্য, চঞ্চলা তাকে বলতে গেলে একরকম অপমানই করেছে। বেচারা রাজপুরুষ তাই তাকে নগ্নিকা দেখার আশায় সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে।

ব্যক্তিত্বসম্পন্ন চঞ্চলার গৃহে এই নগরীর শ্রেষ্ঠ পুরুষদের সমাবেশ। রাজপুরুষ, কবি, বাগ্মী, ভাস্কর, চিত্রকর। বাররমণী সে, তার গৃহদ্বার সকলের জন্যে উন্মুক্ত, কিন্তু হৃদয়দ্বার নয়। এই নগরীতেই এমন রূপসী আছে যে চঞ্চলার চেয়ে সুন্দরী, এমন রমণী আছে যে চঞ্চলার চেয়ে মেধাবিণী, কিন্তু রূপ এবং মেধার এমন সমন্বয় কি আছে আর? নেই। চঞ্চলার আছে সেই ব্যক্তিত্বের ব্যবহার, যা নেই স্তননিতম্বসর্বস্ব অন্য বাররমণীদের। তাই তার উদার নিমন্ত্রণের মধ্যেও একটি নির্বাচন আছে। আর-যে নারীর ব্যক্তিত্ব আছে, নির্বাচন আছে, সে আহ্বান করে নিয়ে আসে দ্বন্দ্ব, বিরোধ, প্রতিদ্বন্দ্ব। অর্থাৎ ঘটনা, নিস্তাপ সমতল জীবনযাপন নয়-পতনে-উত্থানে দোলায়িত ঘটনা। এবং সেরকম একটি ঘটনাই সংঘটিত হলো সেদিন।


সেদিন সূর্য অস্ত যেতে না-যেতে প্ৰদীপ প্ৰজ্বলিত হতে-না-হতে চঞ্চলার গৃহে উপস্থিত হয় কবি। কবি স্বভাবই ঈষৎ তীব্ৰ অস্থির ও ধৈর্যহীন। যখন সে উপস্থিত হলো, তখনও চঞ্চলার সান্ধ্যকালীন স্নান ও প্রসাধন সাঙ্গ হয়নি। কবি সানন্দে বসে বসে পা নাচায়।

সম্প্রসাধন সম্পন্ন করে ভিতর থেকে অনেকক্ষণ পরে চঞ্চলা যখন বেরিয়ে এল হাস্যোজুল মুখে, তখন সন্ধ্যা উত্তীর্ণ, রীতিমতো রাত্রি নেমেছে। বলল—কি ব্যাপার, কবি আজ এত তাড়াতাড়ি?

কবি সে কথার উত্তর না-দিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে—আরে, এ যে দেখছি কক্ষের ভিতরেই চন্দ্রোদয়। সত্যি চঞ্চলা, তুমি আজ আচঞ্চল দ্বিতীয় চন্দ্রের মতো দীপ্যমান। আমি কিছু কবিতা রচনা করেছি, কিন্তু মনে হচ্ছে ঈশ্বর-রচিত সৃষ্টির কাছে সেসব তুচ্ছ।

হয়েছে, খুব হয়েছে! আঁখিজাদু হেনে বলল যুবতী ।

কবি রীতিমতো নাটকী আবেদন সৃষ্টি করে—আহা আজ রজনীতে না জানি সে কোন ভাগ্যবান পুরুষ এই রূপসরোবরে স্নান করবে? -ওহ, খুব হিংসা হচ্ছে, না?-চঞ্চলা একটি ফোয়ারার মতো কলহাস্য করে ওঠে। তারপর ফোয়ারা শমিত করে বলে—কেন, চন্দ্ররশ্মি এই কবির উপরে কি এসে পড়েনি কোনো দিন?

—তা পড়েছে। তা পড়েছে। কবির সপ্রতিভতা একতিল ভ্ৰষ্ট হয় না। কিন্তু—সেসব তো মনে হয় কোন পূর্বজন্মের কথা। এত সুদূর অতীতে বিষয় বলে মনে হয়, যার অর্ধেক স্মৃতির ভিতরে প্রবিষ্ট বাকি অর্ধেক স্বপ্নের অংশ। আর তুমি, চঞ্চলা, তোমাকে মনে হয় সাধারণ নারী নও তুমি। তুমি দেবী, তুমি ভিনাস, এইমাত্র সমুদ্র থেকে উত্থিত হয়ে এলে, তোমার কেশরাশি এখনো সিক্ত, তোমার শরীর এখনো নীল লবণাম্বুজলের স্মরণে শীতল, তোমার আননে এখনো লিপ্ত হয়ে আছে দুএককণা সমুদ্রশীকর, দেবী তুমি, সমুদ্রউত্থিত ভিনাস তুমি—

কবির স্ত্ৰোত্র যখন এইভাবে অবিরলধারে নিক্ৰান্ত হচ্ছে, আর কানের দুল বিলকিয়ে মাথা ঈষৎ কাৎ করে সহাস্যে আশ্চর্য এক ভঙ্গিতে এই স্তোত্রপাঠ শ্ৰবণ করছে চঞ্চল, কেননা বাধা দেওয়া বৃথা, কেননা বাধা পেলে কবির বচন আরো উদ্বেলিত হয়ে উঠবে।—ঠিক সেই সময় কক্ষের ভিতরে প্রবেশ করে ভাস্কর। দীর্ঘ, বলশালী, সুষম শরীর সে নিজেই এক ব্রোঞ্জ ও পাথরের গড়া ভাস্কর্যের তুল্য।

কক্ষমধ্যে প্রবেশ করেই সে কবিকণ্ঠ নিঃসৃত স্তব শুনতে পেল। হাস্যমুখে সে তাকে শায় দ্যায়—ঠিক বলেছ, কবি। প্রকৃত কবিদৃষ্টি আছে তোমার। আমি ক-দিন থেকে ভাবছিলাম চঞ্চলাকে মডেল করে ভিনাসের একটি মূর্তি রচনা করা যায় কিনা। এখন নিশ্চিত হলাম। দ্বিধামুক্ত এখন কাজে নেমে যাব। কবির অনুমোদন পাওয়া গেছে অজ্ঞাতসারেই।

—বাহ! চমৎকার! কংকনঝংকারে চঞ্চলা স্বনিত-ক্কণিত হয়ে উঠল—শুড়ির সাক্ষী মাতাল এসে গেছে।

ভাস্কর আরাম করে বসে একটি কেদারায়। কানেও নেয় না চঞ্চলার কথা। বলে—আমি আগামীকাল থেকেই কাজ শুরু করতে চাই। কাল কি তোমার সময় হবে, চঞ্চলা? আসতে পারবে আমার আলয়ে?

—উহ! তর সইছে না আর কারো! চঞ্চলা কটাক্ষ হানে। এই সময় চিত্রকর, গায়ক, বাদক, বাগ্মী প্রভৃতির একটি দল এসে উপস্থিত হয়। এদের মধ্যে বাগ্মী বয়স্ক, তার একমাথা শ্বেতশুভ্র চুলশাদা। পতাকার মতো উড্ডীন, কিন্তু তার মুখাবয়ব তারুণ্যে প্রদীপ্ত। আর দীর্ঘ কৃশকায় নবযুবকটি গায়ক, এই আসরে সে-ই সবচেয়ে অল্পবয়স্ক,—চঞ্চলার গৃহে আজই সে প্রথম এল। অন্যেরা চঞ্চলার পুরাতন প্রণয়ী ও উমেদার। এরা সব এক আসর থেকে একসঙ্গে এখানে চলে এসেছে।

সম্ভাষণ বিনিময় পর সবাই উপবেশন করল। চঞ্চলা ভিতরে গেল একটুক্ষণের জন্য। চঞ্চলার উদ্দেশে তার স্তব ব্যাহত হওয়ায়, এবং একটু বেশি ভিড় হয়ে যাওয়ায়, কবি ভিতরে ভিতরে বেশ ক্রুদ্ধ হয়ে পড়ে। বেচারা নবীন যুবা গায়কটি তার ব্যঙ্গবাণের লক্ষ্য হয়ে ওঠে।

চঞ্চলা ফিরে আসে একটু পরে। তার পিছু পিছু কয়েকজন দাস-দাসী প্রচুর সুখাদ্য ও সুরা নিয়ে আসে।

তারপর চলে পান, ভোজন, হাস্যরসালাপ৷ চঞ্চলার কণ্ঠে গীত হয় মধুস্রাবী একটি গান। এইসব যখন চলছে, তখন একজন দাস এসে সংবাদ দ্যায়, কে একজন বার্তাবাহক দেখা করতে চাচ্ছে।

—বার্তটি নিয়ে এলে হয়। কেউ একজন বলল।—
দাস উত্তর দ্যায়—না, তিনি নিজের হাতে দেবেন, বললেন।—

কবিই বলে—এখানে আসতে বলো তাকে।

কিছুক্ষণ পরেই দাসের সঙ্গে বার্তাবাহকটি এসে উপস্থিত হয় উৎকণ্ঠিত সবার সম্মুখে। অভিবাদন করে সে একটি পত্ৰ চঞ্চলার হাতে অৰ্পণ করে। পত্রটি পাঠ করতে করতে চঞ্চলার মুখবর্ণ প্রথমে রক্তিম পরে শাদা হয়ে যায়। কবি দ্রুত সেটি নিজের হাতে গ্ৰহণ করে। তারপর বার্তাবাহকের দিকে ফিরে তাকালে সে অভিবাদন করে প্রস্থান করে।

পত্রটি পাঠ করে কবি গম্ভীর হয়ে যায়। তারপর গভীর অথচ উত্তেজিত কণ্ঠে কিন্তু যথাসম্ভব আত্মসংবরণ করে বলে—এখানে যারা উপস্থিত আছেন, তারা সবাই চঞ্চলার ঘনিষ্ঠ । তাই এটি চঞ্চলার প্রতি একটি ব্যক্তিগত পত্র হলেও আমরা সবাই এর অংশভাগী । সেজন্যেই আমি এর সারাৎসার আপনাদের জানাতে চাই । তারপর আমাদের যথাকতব্য স্থির করতে হবে। পত্রটি এসেছে আমাদের বিচারসভা থেকে। এতে বলা হয়েছে, চঞ্চলা এই নগরের পুরুষদের বিপথগামী করছে, তাদের চরিত্র নষ্ট করছে, এ-জন্যে নগরের গৃহবধূরা বোধ করছে বিপন্ন, এবং তারা মহান বিচারকবৃন্দের কাছে অভিযোগ পেশ করছে এর বিহিত করার জন্যে। নগরের বিচারসভা এই বিচারের ভার গ্রহণ করেছে। তদনুযায়ী চঞ্চলাকে আগামীকাল বিচারসভায় উপস্থিত থাকতে হবে। প্রধান বিচারপতির স্বাক্ষরে এই পত্র প্রেরিত হয়েছে।

এই বিবরণ শুনে প্রত্যেকের মুখ ব্যথিত, ক্লিষ্ট ও ত্ৰাসিত হয়ে উঠল। বিচারসভার আহ্বানের অর্থ কি, সবাই জানে। নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড, অথবা নির্বাসন, অথবা অনুরূপ কোনো কঠিন শাস্তি। মুহূর্তে সমস্ত আনন্দ ও আলো নির্বাপিত হয়ে সারা ঘরে নেমে এল হিম নীরবতা।

নীরবতা ভঙ্গ করে চঞ্চলাই প্ৰথম কথা বলল। বলল—এ কার কীর্তি আমি জানি।

—কার? একসঙ্গে চীৎকার করে উঠল। সকলে।

—এ সেই রাজপুরুষের কীর্তি যাকে আপনারা চেনেন, যিনি এখানে আসেন, কিন্তু দিনের পর দিন মাসের পর মাস বছরের পর বছর আমার প্রণয় প্রার্থনা করেও সম্ভাষণ বিনিময় পর সবাই উপবেশন এখানে আসবে না বলে প্রতিজ্ঞা করে। ভাস্কর ভাবছিল, চঞ্চলার একটি প্রতিমূর্তি রচনার যে-আকাঙ্ক্ষা ছিল তার, তা আর বুঝি পূর্ণ হলো না। কবি ভাবল, শেষ পর্যন্ত কি হয় দেখাই যাক। একটা কি আলোকসম্ভব কিছু ঘটতে পারে না!


মৃত্যুদণ্ডই হতে যাচ্ছিল চঞ্চলার। একেবারে শেষ মুহূর্তে প্রায় অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে বাগ্মীর বুদ্ধিতে । শেষ বিচারের দিন, যখন সমস্ত বিচারক সমাসীন, বাগ্মী হঠাৎ এগিয়ে এসে একটানে খুলে ফ্যালে চঞ্চলার পোশাক। আর মুহূর্তে উন্মোচিত হয়ে যায় অসামান্য এক শরীর-প্রাচীন নগরীর কারুকার্য-খচিত এক মুখমণ্ডল, নিশীথের অন্ধকারে রচিত কেশদাম, দীঘল ও তষী শরীর, নিটোল পরিপূর্ণ কোমল কঠিন স্তন ও শ্রোণী। একমুহূর্ত নিস্তব্ধ থেকে সমস্ত বিচারক এক-বাক্যে রায় দেন : ‘না, অলৌকিক এই শরীরে কোনো পাপ থাকতে পারে না।’


চঞ্চলার গৃহ আজ আবার উৎসবে উতল হয়ে উঠেছে। দণ্ডমুক্তির উৎসব। যেখানে তার অবধারিত মৃত্যু হতে যাচ্ছিল, সে যে জীবিত ফিরে এসেছে, এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! বাগ্মীর অদ্ভুত প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে চঞ্চলা সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে। বসন নির্মোচনের পর চঞ্চলার আমূল নগ্ন শরীর দেখে বিচারকবৃন্দের বিস্ময়ের অবধি ছিল না। ঘটনার আকস্মিকতায়, অলৌকিক শরীরের মহিমা দেখে বিচারকবৃন্দ প্রথমে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন, তারপরই যেন একটি রুদ্ধ প্রস্তর ঠেলে সরিয়ে উচ্ছ্বসিত বেরিয়ে এসেছিল প্ৰশংসার প্রবল স্রোতোধারা। বিচারকবৃন্দ বিমুগ্ধ বিস্ময়ে একবাক্যে বলেছেন, এ শরীরকে কোনো পাপ স্পর্শ করতে পারে না, এ ঈশ্বরের আশীৰ্বাদ, এ দেবীর সাক্ষাৎ মর্তরূপ। যে-ঈশ্বর এই শরীর সৃষ্টি করেছেন, তার কাছেও কৃতজ্ঞ থাকতে হয়। এ এক নিসর্গপ্রতিমা, স্বয়ং ঈশ্বরী। নগরের সর্বত্র—সমস্ত গৃহে, বিপণিতে, ময়দানে, পথচতুরে, কুঞ্জে পানশালায়, বিনোদন-কেন্দ্রগুলোতে আজ আলোচ্য কেবল একটি অলৌকিক নগ্ন নারীশরীর, একটি মানুষী, চঞ্চলা। নগরময় চঞ্চলার মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিল হওয়ার সংবাদ রাষ্ট্র হয়েছে, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রূপকথার মতো একটি ঘটনা। চঞ্চলা হয়ে উঠেছে রূপকথার কেশবতী কন্যা, চন্দ্ৰমালা-মানিকমালার মতো এক স্বপ্নসম্ভব নায়িকা। চঞ্চলাকে যারা দ্যাখেনি, তাদের আগ্ৰহ অসীম স্পর্শ করেছে। চঞ্চলাকে যারা দেখেছে, তারা নিজেদের মনে করছে ভাগ্যবান। সমস্ত নগরবাসীর মধ্যে একটি পুলকের ডানা ও সিরাপ প্রবাহিত হচ্ছে। এই সুযোগে চরিতার্থ হচ্ছে বাগ্মীরও ভূমিকা। তার প্রত্যুৎপন্নমতিত্ত্বের প্রশংসায় লোকে পঞ্চমুখ ।

স্বতন্ত্র একটি গাৰ্হস্থ্য উৎসবের মতো অনুষ্ঠান উদ্‌যাপিত হচ্ছে আজ চঞ্চলার গৃহে। চঞ্চলার নির্বাচিত অতিঘনিষ্ঠ ভক্তমণ্ডলীর মধ্যে। প্রথমে মনে হয়েছিল, চঞ্চলা-ঘটিত এই সমস্যার পরে খানিকটা সতর্ক হবে না কি তারা? পরে মনে হয়েছে, ভয় কী? স্বয়ং বিচারকবৃন্দই শেষ পর্যন্ত রায় দিয়েছেন চঞ্চলার পক্ষে। সুতরাং নির্বিঘ্নে আনন্দ উদ্‌যাপিত হোক।

চঞ্চলার গৃহে হলেও আজকের অনুষ্ঠানের আয়োজক এই নগরের একজন বিখ্যাত বণিক—তিনি চঞ্চলার করুণাধন্য। আজই প্ৰাচ্য থেকে বিচিত্ৰবিধ বিরল ও মহার্ঘ জিনিশপত্ৰ সমেত তাঁর একটি জাহাজ এসে ভিড়েছে নগরপ্রান্তস্থ সমুদ্রে। আনন্দিত তিনি এই উৎসবের আয়োজন করেছেন। চঞ্চলার ছোট্ট সুন্দর ভবনের প্রতিটি কক্ষ আজ বিচিত্ৰবৰ্ণ আলোকমালা ও পুষ্পসজ্জায় দীপ্যমান। কক্ষে কক্ষে সুরভি, সংগীত, সুরা, আলোক, পুষ্প ও আনন্দধ্বনির তরঙ্গ প্রবাহিত হচ্ছে। গৃহস্বামিনীর এই আনন্দ উৎসবে দাসদাসীরাও শরিক হওয়ার জন্যে সজ্জিত হয়েছে চারু সাজপোষাকে।

ভবনের বৃহৎ কক্ষে আজ সমবেত হয়েছে চঞ্চলার অতি ঘনিষ্ঠেরা—বাগ্মী, ভাস্কর, চিত্রকর, কবি, নাট্যকার, গায়ক, বাদক প্রমুখ। বাগ্মীর অভিনব কৌশল প্রয়োগের প্রশংসা হচ্ছে। তিনিও সবিস্তারে জানাচ্ছেন, কী অবস্থায় কীভাবে তিনি ঐ কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন, এবং বিচারকবৃন্দের দৃষ্টি ও প্রতিক্রিয়ার অনুসূক্ষ্ম বিবরণ। চঞ্চলার কাছে পূর্বাহ্নে বাগ্মী তাঁর কূট অভিপ্ৰায় ব্যক্ত করেননি, কেবল তাকে কোনো অন্তর্বাস না-পরে আসতে বলেছিলেন—যাতে একটানে পোশাক খুলে ফেলে তাকে নগ্ন করে ফেলা যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় চঞ্চলাও হতচকিত হয়ে পড়েছিল, এবং তার লজ্জাকরুণ মুখ লুকিয়েছিল দু’হাতের পাতার আড়ালে। হয়তো লজ্জাই তার শরীরের গুরুভার, ক্ষীণতা ও বঙ্কিমায় এমন লাবণ্য সঞ্চার করেছিল যাতে অভিভূত হয়েছিলেন বিচারকবৃন্দ। আজ এখানেও, চঞ্চলার ভবনে তার রূপের স্তুতি চলছে। বাররমণীদের মধ্যে চঞ্চলা যে শ্রেষ্ঠা এবং তুলনাহীনা, তা কি প্রমাণিত হয়নি? বৃথাই গৃহবধূদের ঈর্ষা, বৃথাই অন্য অন্য বাররমণীদের দগ্ধ হওয়া, প্রেমপ্রত্যাখ্যাত রাজপুরুষের ক্রোধও ব্যর্থ হলো। এক-পর্যায়ে অভিযোগকারী রাজপুরুষকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ হাসি-মশকরার অজস্র বাণ বর্ষিত হয় ।

বিজয়িনী চঞ্চলার জন্যে প্ৰত্যেকেই তার ব্যক্তিগত প্ৰীতির অর্ঘ্য নিয়ে এসেছে। বেচারা তরুণ গায়ক প্রতিজ্ঞা করেছিল যে চঞ্চলার গৃহে আর কখনো আসবে না। কিন্তু এরকম আনন্দ-উৎসবের দিনে কি না এসে পারা যায়? সে একগুচ্ছ দুর্লভ জাতের গোলাপ নিয়ে এসেছে। চঞ্চলার জন্যে কবি আজই কোন ফাঁকে যেন রচনা করেছে একটি চন্দ্রকরোজ্জ্বল কবিতা। সমবেত হর্ষধ্বনির মধ্যে কবি তার কবিতাটি মন্দ্ৰকণ্ঠে পাঠ করে শোনায়। সকলের মন স্পর্শ করে, সকলের আনন্দ যেন কবিকণ্ঠে উচ্চারণ খুঁজে পেয়েছে। ভাস্কর ঘোষণা করে, সমস্ত কর্ম বাদ দিয়ে সে যতদিন লাগে চঞ্চলার এই অসাধারণ শরীর-সম্পদের একটি অনুকল্প রচনা করবে। শরীরের মৃত্যু তো একদিন হবেই, জরা ও বার্ধক্য তো একদিন শরীরকে আক্রমণ করবেই, কিন্তু এই শরীরের একটি ছাঁচ চিরকালের মানুষের আনন্দ বর্ধনের জন্যে রেখে যাওয়া চাই। তারপর সুললিত কণ্ঠে চঞ্চলা একটি সংগীত নিবেদন করে—সেই সংগীতের মর্ম শুধু আনন্দ, আনন্দ, আনন্দনিষ্যন্দিত আকাশ। আর যতক্ষণ গান চলতে থাকে, ততক্ষণে চিত্রকর চঞ্চলার একটি গীতরত ছবি অংকন করে চলে, এবং গীত সমাপ্ত হলে সেটি সমর্পণ করে চঞ্চলাকে। চঞ্চলা সবাইকে দেখায় ছবিটি। সবিস্ময়ে সকলে দ্যাখে, চিত্রে অবিকল রূপায়িত হয়েছে সংগীতরত চঞ্চলার মুখশ্ৰী ও দেহভঙ্গিমা। তারপর সকলের অনুরোধে, কবি যতক্ষণ না তাকে অনুরোধ করে ততক্ষণ অপেক্ষা করছিল, তরুণ গায়ক গান করে। তার কণ্ঠস্বর গভীর ও সুশ্রাব্য। তারপর চঞ্চলা একটি নৃত্য পরিবেশন করে—এই নৃত্যের বিষয় খাঁচা থেকে ছাড়া পাওয়া একটি পাখির ফুরফুরে প্রমুক্তি ও আনন্দ। বাগ্মী তখন অসম্ভব সরস কয়েকটি গল্প পরিবেশন করে—সকলের হাস্যারোল রাত্রির সুনীল আকাশে রঙিন ফানুশের মতো উড়ে যেতে থাকে। রাত্রি যত অধিক হতে থাকে নগরের কোলাহল যত নির্বাপিত হতে থাকে, ততই এই গৃহের আনন্দ যেন হতে থাকে বর্ধিত। সব শেষে, আজকের অনুষ্ঠানের মূল আয়োজক বণিকশ্রেষ্ঠের প্রস্তাবে, এবং সকলের সানন্দ সমর্থনে, চঞ্চলা একটি সম্পূর্ণ বিবসন নৃত্য পরিবেশন করে। সকলের প্রস্তাব ও অনুরোধকেও ছাড়িয়ে যায় চঞ্চলার নিজস্ব বুদ্ধিমতী যোজনা—বিবসন হয়ে সে উপস্থিত হয় ঠিকই, কিন্তু সালংকারা। তার মস্তকে, কৰ্ণে, কণ্ঠে, বাহুতে হস্তে, কটিতে, জঘনে, পায়ে অলংকাররাশি স্থির হয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপরই তার বাহুর বিক্ষেপে, জঘনের আন্দোলনে, পদক্ষেপের দ্রুততালে যেন কক্ষের ভিতরে স্বর্গের হিল্লোল একের পর এক স্পন্দিত হয়ে যায়। চঞ্চলার শরীর হয়ে ওঠে একটি সংগীত, সেই নৃত্যে কাম যেন স্বয়ং প্রমূর্ত হয়ে পাঁচটি ইন্দ্ৰিয়ের একটি ইন্দ্ৰধনু জ্বেলে দ্যায়।

নৃত্যশেষে দ্রুত ভিতরে অন্তৰ্হিত হয় চঞ্চলা। এবং অনেকক্ষণ ফেরে না। চঞ্চলার প্রস্থানের পরেও কিছুক্ষণ সবার কাটে নির্বাক এবং রুদ্ধশ্বাস। তারপরই আবার শুরু হয় বাক্যালাপ৷

কবি কেবল কাব্যলোকেই অধিষ্ঠান করে না, দেখা যায় তার মাথাও খেলে অচিন্তনীয় সব দিকে দিকে। হঠাৎ সে বলে-আচ্ছা, আজ তো সমস্ত নগর একটি আলোচনাতেই শুধু মুখরিত-চঞ্চলার। আমরা এখানে যারা সম্যকভাবে উপস্থিত তারা তো বটেই, এমনকি মহান বিচারকবৃন্দ, এমনকি সাধারণ নগরবাসী পর্যন্ত সবাই চঞ্চলাতে মুগ্ধ, নিবেদিত, সর্বসমর্পিত। এখন বলুন তো দেখি, এই নগরেই এমন কে আছে, যাকে এসব আনন্দ ও উত্তেজনা কিছুমাত্র স্পর্শ করছে না? যিনি আজ বিচারসভাতেও যাননি, আসেননি। এখানেও, এবং চঞ্চলার উপস্থিতি যাকে কিছুমাত্র চঞ্চল করে না, এমন কে আছেন?

জানা ছিল সকলেরই, কিন্তু প্ৰসঙ্গটা কেউ ভেবেই দ্যাখেনি, এখন প্রসঙ্গ তোলা মাত্র তার কথা মনে পড়ল। তাছাড়া কবির বাক্যের যেন একটি নিটোল ধাঁধার অপরূপ সুরাহা করছে এম্নি কলরোল করে বলে উঠল—দার্শনিক!! দার্শনিক মহোদয়!

—ঠিক বলেছেন। কবিও সহৰ্ষে বলে।—এখন বলুন এই যে অরসিক দার্শনিক, একি সেই প্রস্তরের তুল্য নয় যে হাজার বছর ঝর্নাজলে স্নাত হয়েও একফোঁটা রস পেল না?

চিত্রকর বলল—তা তো বটেই।

—বেশ। সোৎসাহে বলে কবি—এখন বলুন, এটা কি অমানবিক নয় যে সমস্ত নগরবাসী চঞ্চলার রূপে নিমজ্জিত হলো, অথচ একজন হলো বঞ্চিত?

—বুঝলাম, বুঝলাম—ভাস্কর অধৈৰ্য । এত ভনিতা না-করে পরিষ্কার করে বলুন তো, কী বলতে চাচ্ছেন আপনি?

—ঠিক। ঠিক সেখানেই এসে আমি পৌঁছেছি, যেখানে সোজা আমার প্রস্তাবটি পেশ করা যাবে। আমার প্রস্তাব আর কিছু না, একটি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই বলছি, আজকের এই অবিস্মরণীয় রাত্ৰেই বেচারা দার্শনিককে জীবনের মধুভাণ্ডের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হোক। অর্থাৎ চঞ্চলা আজ রাত্রেই তাঁর নৈঃশব্দ্য, গাম্ভীৰ্য, কৌমার্য এবং একাকিত্ব ভঙ্গ করবে।

—অসম্ভব। প্রতিবাদ করে উঠল বাগ্মী। —দার্শনিক মহোদয়কে টলানো যাবে না একটুও। তিনি নির্বাকপ্রায় এবং আত্মস্থই থেকে যাবেন। আপনারা কি লক্ষ্য করেননি, এই নগরে কারো সঙ্গে মিল নেই তার? যদিও তিনি এই নগরের অধিবাসী, আমাদের কি মনে হয় না তিনি এই নগরের নন?

—নগরের না হোন, নাগরিকদের হতে দোষ কী। কবি পরিহার করে বলেসেটাই পরীক্ষা হোক রাত্রে। চঞ্চলার বিজয় সম্পূৰ্ণ হোক।।

আর সেই মুহূর্তেই সুবেশিনী চঞ্চলা পুনঃপ্রবেশ করে। কলরব করে ওঠে সবাই। চঞ্চলা বিস্মিত চক্ষে ও কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে—আবার কি হলো? এত হুল্লোড়?

কলরব। হর্ষ। আলোমালা। সুরা। সুরভি।

নগরী প্রায় নীরব হয়ে এসেছে। শুধু এই বাড়িটি থেকে উত্থিত হচ্ছে। কোলাহল। বাইরে, ঈশ্বরের পৃথিবীতে তখন নেমে এসেছে নীল নিস্তব্ধতা ও শ্বেত শান্তি । বাইরে, ঈশ্বরের নীলিমায় মেঘের ভিতর দিয়ে একটি মসৃণ সোনার তরীর মতো চন্দ্র ভেসে চলেছে।


এখন অনেক রাত্রি। শান্ত হয়ে রয়েছে বেদনা। নগরীর কিনারায় সমুদ্র নিথর হয়ে এসেছে। গম্ভীর হয়ে রয়েছে জাহাজ ও কালপুরুষ।

দার্শনিক মহোদয় একটু অন্যধরনের। তিনি কোনো গ্রন্থ রচনা করেননি। কোনো দার্শনিক বক্তৃতাও তিনি করেন না। জনসমাজে তাঁকে কেউ কোনোদিন দ্যাখেনি। কদাচিৎ তিনি গৃহের বাইরে পদার্পণ করেন। দু-একটি উচ্চারণ তিনি করেছেন, দু-একটি কথা তিনি বলেছেন কারো কারো সঙ্গে। তাতেই রাষ্ট্র হয়ে গেছে তিনি একজন দার্শনিক।

এখন বাইরে জ্যোৎস্নারাত্রি, বাইরে নীলিমা ও নিস্তব্ধতা। কিন্তু প্রকৃতি দার্শনিককে একতিল আকর্ষণ করে না। ঘরের ভিতরে একটি প্ৰদীপ প্রজ্জ্বলিত। তিনি স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন একটি কেদারায়। চোখ বুজে ধ্যানস্থ হয়ে আছেন। এরকমভাবেই তাঁর অধিকাংশ সময় কাটে ।

এমন সময় বহিৰ্দ্ধারে দ্রুত করশব্দ শুনে চকিত হয়ে উঠলেন তিনি। দাসদাসীরা নিদ্রাগত। এত রাত্রে কষ্ট করে উঠবে তারা? ভেবে তিনি অগ্রসর হয়ে এসে দুয়ার অবারিত করে দিলেন। আর, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে প্রায় ঠেলে এক সুন্দরী কক্ষের ভিতরে চলে এল ।

দার্শনিক একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—কে তুমি? কি হয়েছে?

সুন্দরীর আননে ও শরীরে তখনো ত্ৰাসের চিহ্ন। বলল—আমি এ পথ দিয়ে একটি যানে গৃহে ফিরছিলাম। এমন সময় কয়েকজন দূৰ্বত্ত আমাকে আক্রমণ করে। তাই আমি দ্রুত যান থেকে অবতরণ করে পালিয়ে এসেছি আপনার আশ্ৰয়ে। আমার নাম চঞ্চলা। আপনি আমাকে বাঁচান।

দার্শনিক চঞ্চলার পোশাকের দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। আস্বচ্ছ পোশাকে চঞ্চলার শরীর প্রায় দৃশ্যমান। এই পোশাকে এত রাত্রে কি কেউ বাইরে বেরোয়?—দার্শনিক ভাবলেন। আর চঞ্চলা ভাবল, এই তো, এই তো তিনি ঐশ্বৰ্য প্রায় সম্পূর্ণই তাঁর কাছে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে আরো ঐশ্বর্যের। এই তো, এই তো আমার দখলে, প্রস্ফুটিত পুষ্পে ভ্রমরের মতো তার চোখ লগ্ন হয়ে আছে আমার শরীরে। দার্শনিকের বাড়ির সম্মুখের রাস্তার ওপারে পানশালায় কবি-দার্শনিক-চিত্রকর-বাণী-বণিকেরা অপেক্ষমান। সুরাপান করতে করতে তারা জল্পনা-কল্পনা করছে, কোন পরিণাম অপেক্ষা করে আছে তার। বিজয়িনী চঞ্চলা হয়তো একটু পরেই তাদের জানাবে, নগরীতে আর একটি পুরুষও নেই যে নয় তার রূপে মুগ্ধ, লোভাতুর ও নিমজ্জিত।

স্বচ্ছ বসনটিও একটানে খুলে ফেলল চঞ্চলা। তারপর আমূল নগ্নিকা চঞ্চলা নিজেকেও উন্মোচিত করল। সৌরভের মতো নিম্নক্রান্ত হলো তার কণ্ঠস্বর-দার্শনিক মহোদয়, আপনি আমাকে চেনেন না। আমি চঞ্চলা—এই নগরের বাররমণীদের শ্রেষ্ঠা। আমার কটাক্ষপাতে শিহরিত হয় না এমন পুরুষ নেই এই নগরে, আমি তাদের স্বপ্নকল্পনালোকের রানি। এমন জ্যোৎস্না ও আনন্দময় রজনীতে আপনি কেন, একাকী, বিমর্ষ ও চিন্তামগ্ন?—বলতে বলতে দার্শনিককে লঘু আলিঙ্গন করল চঞ্চলা।

দার্শনিক একখণ্ড শীতল নিস্তাপ রক্তহীন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন।

একটু পরে ছিটকে বেরিয়ে এল চঞ্চলা। দলিত ক্রুদ্ধ সাপিনীর মতো চীৎকার করে উঠল—আপনি আমাকে অপমান করছেন, আমার সৌন্দর্যকে অপমান করছেন। এই নগরে এমন কোনো পুরুষ নেই যে আমার আলিঙ্গনের প্রত্যুত্তরে আপনার মতো অনড় ও নিস্তাপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। আপনি কেন জীবনের আনন্দ থেকে বঞ্চিত রাখবেন নিজেকে? কেন শরীরের আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকবেন? আমি কি আপনার যোগ্য নই? আপনি কেন আমাকে অপমান করবেন?

তখনো দার্শনিকের দৃষ্টি চঞ্চলার আমূল নগ্ন শরীরে নিপতিত। দার্শনিকের দৃষ্টি দেখে চঞ্চলার এই প্রথম নিজেকে মনে হলো নগ্ন। কিন্তু দার্শনিক তো তাকিয়ে আছেন। শুধু, তাঁর শরীর তো সাড়া দিচ্ছে না, আর তাঁর কণ্ঠে কেন বাক্যশূন্য?

চঞ্চলা আবার উষ্ণ আলিঙ্গন করল দার্শনিককে। কাতর কণ্ঠে অনুনয় করল—আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না, দার্শনিক। বন্ধুদের কাছে আমার সম্মান তাহলে ধুলোয় লুটোবে। দয়া করুন। আপনি, দয়া করে দয়া করুন। আমি নারী আমাকে গ্ৰহণ ধন্য করুন। করে আপনি কি পাষাণ? ধিক আপনার মনুষ্যজন্মে! ধিক আপনার পুরুষজন্মে!

দার্শনিক চঞ্চলার কঠিন আলিঙ্গন ছাড়িয়ে সরে দাঁড়ালেন। তাঁর কঠোর কণ্ঠ যথাসাধ্য বিনীত করে বললেন—চঞ্চলা, তুমি অধীর হোয়ো না। নগরের সমস্ত পুরুষই তো তোমার রূপমুগ্ধ, একজনই না হয় থাকল তার বাইরে?

—কেন, কেন তা হবে? আমার সৌন্দর্যের চেয়ে আপনার বিষন্নতা কি বেশি মূল্যবান? আমার কি কোনো নিজস্ব সাধ-আহলাদ নেই? আমাকে কি আপনি অন্য সব অশিক্ষিতা রুচিহীনা বাররমণীদের তুল্য জ্ঞান করেন? আমাকে কি আপনি মনে করছেন সাধারণ রূপজীবিনী? জানেন, আমার প্রণয়প্রার্থীদের মধ্যে আছে এই শহরের শ্রেষ্ঠ গুণীরা-কবি, ভাস্কর, চিত্রকর, গায়ক, বাদক, বাগ্মী প্রমুখ। শুধু আপনি আমাকে তুচ্ছ জ্ঞান করলেন। ছি-ছি! বৃথাই আমার নারীজন্ম! —যেন হাহাকার করে উঠল। চঞ্চলা ।

—না। তোমার দোষ নেই। দোষ আমার! কিন্তু আমি কি করব, চঞ্চলা? আমি তোমার অসামান্য সুন্দর শরীরের ভিতরের কঙ্কাল যে দেখতে পাচ্ছি। আমি কি করব? আমি কি করব? আমি নিরুপায়।

দার্শনিকের কম্পিত কণ্ঠস্বর শুনে তাকাল চঞ্চলা। দেখল, দার্শনিকের চোখ অশ্রুসজল৷৷

(১৯৮২)

No comments:

Post a Comment

কথামালা Designed by Templateism | Blogger Templates Copyright © 2014

Theme images by mammuth. Powered by Blogger.