Stories

আত্মজ -

মা আজ চলে গেল। একটু আগে বৈদ্যুতিক চুল্লির গহ্বরে ঢুকে গেছে মা। পুড়ছে। পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে দ্রুত।
আমার যেন এখনো ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না। সকালে যখন অফিসে বেরোই, তখনো তো সব ঠিকঠাক ছিল। যেমন থাকে।
দিনটাও আজ শুরু হয়েছিল আর পাঁচটা দিনের মতোই। মাঘের শুরুতে এবার শীতটা বেশ জাঁকিয়ে এসেছে, সকালে লেপ ছেড়ে বেরোতে ইচ্ছে করছিল না যথারীতি। শুয়ে শুয়েই শুনতে পাচ্ছিলাম সংসার নিয়ে হুড়দ্দুম ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সুপ্তি। দুধ খাওয়া নিয়ে রোজকার মতোই গাঁইগুঁই করছে মামপি গোগোল, জোর কিচিরমিচির জুড়েছে, সুপ্তি কষে ধমকাল ছেলেমেয়েকে, এক ফাঁকে চা দিয়ে গেল আমায়, মার আয়াকে ডেকে কী যেন নির্দেশ দিল। রুটিনমাফিক শব্দ বেজে চলেছে সংসারে। মার স্পঞ্জের জন্য জল গরম করছে আয়া, ঠিকে ঝিয়ের সঙ্গে কী যেন কথা চালাচালি হলো, সুপ্তি ছেলেমেয়ের টিফিন বানাচ্ছে …। দ্যাখ না দ্যাখ মামপি গোগোল স্কুলবাস এসে গেল, আমিও লাফ দিয়ে উঠে বাথরুমে ফিরেই ঝটপট দাড়ি কামানো, কনকনে জলে কাকস্নান…। ডাইনিং টেবিলে সুপ্তি একখানা লিস্ট ধরিয়ে দিল। পরশু মামপিদের স্কুলে স্পোর্টস, মেয়ের জন্য লাল বর্ডার দেওয়া এক জোড়া জুতা চাই। ওয়াটার ম্যাট্রেসে শুয়েও টুকটাক বেডশোর বেরোচ্ছে মার, শয্যাক্ষতর মলম আনতে হবে। মনে করে চা। অফিসপাড়ার দোকানটা থেকে। এরপর মিনিবাসে লাইন, কান ঘেঁষে লেট বাঁচিয়ে অফিসে প্রবেশ, বারতিনেক জিএমের আসা-যাওয়া, ফাইল কম্পিউটার আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে সহকর্মীদের সঙ্গে মৃদু আলাপচারিতা। তপন বাবু সাতচল্লিশ বছর বয়সে বিয়ে করেছে, তাকে আমরা উইগ্ প্রেজেন্ড করব, না ফলস টিথ তা নিয়েও হাসাহাসি হলো একচোট।
সবই চলছিল গতানুগতিক ছন্দে কিংবা নিতান্তই ছন্দহীন।
ছবিটা বদলে গেল দুপুরে। হঠাৎই।
টিফিন আওয়ারে তখন একটু ক্যারাম পিটিয়ে নিচ্ছিলাম। আজকাল ছুটির পর আর রিক্রিয়েশান রুমে ঢোকার জো নেই, ফিরতে সামান্য দেরি হলেই যা খিটখিট করে সুপ্তি। আমি ঘরে বন্দি, আর তুমি ফুর্তি মেরে বেড়াচ্ছ …! সত্যি তো, বেচারা এখন একদমই ঘরে আটকা। একদিকে ছেলেমেয়ে, সংসার, অন্যদিকে অনন্তশয্যায় শুয়ে থাকা পক্ষাঘাতগ্রস্ত শাশুড়ি, সুপ্তির এখন একেবারে চিঁড়েচ্যাপটা দশা। এদিক-ওদিক ঘোরা, সিনেমা-থিয়েটার সবই তো গেছে, রুগ্ন শাশুড়ি ফেলে বাপের বাড়িই বা যেতে পারে কদিন। গেলেও প্রতি মুহূর্তে হানটান, এই ফিরতে হবে, এই ফিরতে হবে। অগত্যা গৃহশান্তি বজায় রাখতে আমাকেও গুহায় সেঁধতে হয় জলদি জলদি।
তো আজ সবে দ্বিতীয় বোর্ড খেলছি, রবীনদার ডাক, অমিত, তোমার টেলিফোন।
রেডটা পকেটের মুখে। ঝুলছে প্রায়। স্ট্রাইকার সেট করতে করতে বললাম, কার ফোন?
—তোমার বাড়ি থেকে। মনে হলো তোমার গিন্নি।
শুনেই কেমন খটকা লেগেছিল। সুপ্তি তো তেমন দরকার ছাড়া ফোন করে না? লাল ঘুঁটি রয়েই গেল। তাড়াতাড়ি এসে রিসিভার তুলেছি,
হ্যালো, কী হলো?
—অ্যাই শোনো, মা কেমন করছেন!
—সে কী? কেন? কী হয়েছে?
—ভয়ানক নিশ্বাসের কষ্ট… চোখটোখ কেমন উলটে যাচ্ছে।
—সর্বনাশ, কখন থেকে?
—এই তো … আমি একটু মণিকাদিদের ফ্ল্যাটে গেছিলাম, রমা ডেকে আনল। বলছে গলা ভাত খাওয়ানোর পর থেকেই নাকি কেমন কেমন করছিলেন।
—কখন খাইয়েছে?
—যেমন খাওয়ায়। বারোটা-সওয়া বারোটা।
—সঙ্গে সঙ্গে বলেনি কেন?
—অতটা নাকি বুঝতে পারেনি। … মার হাত-পাও কেমন ঠাণ্ডা মেরে যাচ্ছে!
—ডাক্তার বাবুকে ডেকেছ?
—এক্ষুনি আসবেন। … তুমি চটপট চলে এসো। আমার কিন্তু ভালো ঠেকছে না।
তখনো চরম কিছু ঘটার কথাটা মাথায় আসেনি। ট্যাঙ্েিত আসতে আসতেও ভাবছিলাম এমন হলো কেন? লাঙ্ ইনফেকশন। ডাক্তার বাবু রুটিন চেকআপের সময়ে একদিন বলছিলেন, শুয়ে থাকতে-থাকতে এসব রোগীর পেশি নাকি আপনি শিথিল হয়ে আসে, তখন ফুসফুসে খাদ্যকণা ঢুকে যাওয়া অসম্ভব নয়। তার থেকেই সংক্রমণ! কী একটা যেন নামও বলেছিলেন রোগটার। কী এক নিউমোনিয়া। অবশ্য ঠাণ্ডাটাণ্ডা লেগেও …। কতদিন রাত্তিরে পেচ্ছাপ করে মা তার ওপরেই পড়ে থাকে, রমা ওঠেও না, ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোয়। ক্যালাস মেয়েছেলে। আবার একটা আতান্তরে ফেলল। তেমন বাড়াবাড়ি হলে এক্ষুনি হয়তো নার্সিং হোমে রিমুভ করতে হবে। বাড়িতে কত টাকা আছে? আজ মাসের উনিশ, মেরেকেটে হাজার দুই। ওতে কি-ই হবে? ব্যাংক তো প্রায় ফরসা… আবার ধার করব? আবার? শালা ধারে ধারে এবার ন্যুব্জ হয়ে যাব। কার কাছে চাওয়া যায়? প্রবীরদা একবার গেয়েছিল, দরকার লাগলে বোলো। সুপ্তি অবশ্য ওর দাদার কাছে টাকা চাওয়াটা পছন্দ করে না। খুকুদিকেও অ্যাপ্রোচ করা যায়। বোনঝি হলেও খুকুদি তো মার মেয়েরই মতন। খুকুদির বিয়েতে মা নিজের একটা নেকলেস্ ভেঙে গয়না গড়িয়ে দিয়েছিল। খুকুদি হয়তো ফেরাবে না, কিন্তু আমি ফেরত দেব কোত্থেকে? ফের একটা পিএফ লোন? নাকি নার্সিং হোমে না নিয়ে গিয়ে হাসপাতাল …। খরচাটা তাও একটা মাপের মধ্যে থাকে।
কিছুরই প্রয়োজন হলো না। বাড়ি এসে দেখি সব শেষ। আশপাশের ফ্ল্যাটের বেশ কয়েকজন ঘরে থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে, সুপ্তি মায়ের খাটের বাজু ধরে স্থির, রমা পায়ের কাছে, মামপি গোগোল তখনও স্কুল থেকে ফেরেনি।
আমার কেমন ঘোর ঘোর লাগছিল। এক দীর্ঘ ক্লান্তিকর অধ্যায়ের এত আকস্মিক পরিসমাপ্তি?
টানা দুই বছর মা শয্যাশায়ী। সেরিব্রাল অ্যাটাকের দিনটা থেকে ধরলে তারও বেশি। প্রায় পঁচিশ মাস। নিখুঁতভাবে গুনে গেঁথে দেখলে সাতশো চুয়ান্ন দিন। এর মধ্যে একটি দিনের তরেও উঠে বসা দূরে থাক, নিজে নিজে নড়াচড়াও করতে পারেনি মা, পাশটুকুও ফিরিয়ে দিতে হতো। এই পঁচিশ মাসে একটা শব্দ পর্যন্ত বেরোয়নি মার গলা থেকে, গোঙানির আওয়াজও না। আমিও ধরে নিয়েছিলাম মা এভাবেই পড়ে থাকবে। রোজই মনে হতো মা আজকের দিনটাও রয়ে গেল, কালকের দিনটাও থাকবে, তার পরের দিনটাও …
কিংবা হয়তো আলাদা করে এত কথাও মনে হতো না। শুধু হৃদয়ের গভীরে গেঁথে গিয়েছিল একটা ধারণা—নিছক অস্তিত্ব হয়েই মা বুঝি কাটিয়ে দেবে অনন্তকাল। এর বাইরে অন্য কিছু ঘটা বুঝি সম্ভবই নয়।
খবর পেয়ে আত্মীয়স্বজন আসছিল একে একে। সন্ধ্যে নাগাদ বাড়ি ভিড়ে ভিড়। অনেকটা সেই নার্সিং হোমে যেমন দল বেঁধে সবাই মাকে দেখতে যেত, সেরকম। কিংবা তার চেয়েও বেশি।
এরকমই বুঝি হয়। মানুষের কাছে বিপন্নতার দাম আছে। মৃত্যুরও। মার মৃত্যু-সম্ভাবনাটা দড়কচা মেরে যাওয়ার পর উদ্বেগ ক্ষয়ে গিয়েছিল ধীরে ধীরে।
আমাদের কাছেও। আত্মীয়দের কাছেও। শেষ দেড়টা বছরে কে কবার দেখতে এসেছে মাকে? ওই মাঝে মাঝে ফোনে খোঁজখবর নেওয়া, কালেভদ্রে হয়তো সশরীরে আগমন, ব্যাস ওইটুকুই। অথচ শ্মশানেও আজ আমার পাশে কত লোক। জাঠতুতো দাদারা, খুড়তুতো ভাই, মাসির ছেলে, পিসির ছেলে, শালা, ভায়রাভাই, বন্ধুবান্ধব …
হিমেল রাতে মাকে যন্ত্র-চিতায় চড়িয়ে এখন সবাই দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক। প্রবীরদা হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছে খুকুদির বরের সঙ্গে। কিশোর আর সমু পায়চারী করছে। পল্টুরা চা খেতে চলে গেল।
ঠাণ্ডাটা আজ বেড়েছে। নাকি খোলা জায়গা বলে বেশি লাগছে কামড়টা? চারদিকে ধোঁয়াশার পাতলা আস্তরণ, হ্যালোজেন বাতিগুলোয় কেমন মরা মরা ভাব। রেলিংঘেরা জায়গাটায় মরশুমি ফুল ফুটে আছে কয়েকটা, ফুলেরাও যেন মলিন এখন। শ্মশান বলেই কি? গর্জন করতে করতে একটা ম্যাটাডোর হানা দিল চত্বরে, বিটকেল হরিধ্বনি সহকারে খাট নামাচ্ছে একপাল যুবক। কে যেন চেঁচিয়ে ডাকল কাকে। দূরে কোথাও ছররা চলছে হাসির। ভেতরের হলঘরে জোর একটা কান্নার রোল উঠল। থেমেও গেল।
চন্দন আর রনিদা উঠে গিয়েছিল পাশ থেকে, ফিরেছে। সিগারেট টানছিল রনিদা, টোকা মেরে ফেলে দিল পোড়া টুকরোটা। কাঁধে আলগা হাত রেখে বলল, অ্যাই, এখানে ঠাণ্ডায় কাঁপছিস কেন? চল্, ভেতরে গিয়ে বসি।
—না না, এখানেই ঠিক আছে। ভেতরে বিশ্রী গন্ধ, হইহট্টগোল, কান্নাকাটি … ওখানে দম বন্ধ হয়ে আসছিল।
—তাহলে শালটা ভালো করে জড়িয়ে নে। কান ঢাক। এ সময়ে ঠাণ্ডা লেগে যাওয়াটা মোটেই কাজের কথা নয়।
—বলছি তো ঠিক আছি। তোমরা ব্যস্ত হয়ো না।
রনিদা আর জোরাজুরি করল না। বসেছে পাশে, সিমেন্টের বেঞ্চিতে। চোখ তুলে আকাশ দেখল একটুক্ষণ। আবার সিগারেট ধরাল। লম্বা লম্বা টান দিচ্ছে।
হঠাৎই বলল, পিসিকে আজ একেবারে অন্যরকম দেখাচ্ছিল, না রে বাবলু?
ছোট্ট একটা শ্বাস পড়ল আমার। বললাম, হুঁ।
—মুখে কণামাত্র রোগের চিহ্ন নেই … হুবহু সেই আগের রং ফিরে এসেছিল। মনে হচ্ছিল সেই পুরনো পিসিকে দেখছি।
চন্দন বলে উঠল, কাকির মুখে কী রকম একটা হাসি লেগেছিল লক্ষ করেছ রনিদা?
—হুম। কত কষ্টের অবসান হলো।
—বটেই তো। কিছু বলতে পারে না, বোঝাতে পারে না, কী খারাপ যে লাগত! এবার পুজোর পর প্রণাম করতে গিয়ে মুখের দিকে তো তাকাতেই পারছিলাম না। কী মানুষ তার কী হাল!
—অথচ দ্যাখো, পিসি কিন্তু কখনো কারো পাকা ধানে মই দেয়নি। মা তো সেদিনও বলছিল, ভগবান কিন্তু এটা ন্যায় করলেন না। এত ভালো মানুষ, তারই কি না এই দুর্দশা! … সারা জীবন কী স্ট্রাগলটাই না করেছে পিসি। অসুখ-বিসুখ কিছু নেই, দুম করে পিসে মশাই মারা গেল … বিনা মেঘে বজ্রপাত … বাবলু তো তখন হাফপ্যান্ট। অত বড়ো একটা ধাক্কা সামলেও তো পিসি মাথা উঁচু করে থেকেছে। চাকরি-বাকরি করে একাই মানুষ করেছে বাবলুকে। যখন নিজস্ব ঘরদোর হলো, নাতি-নাতনি নিয়ে একটু সুখের মুখ দেখছিল, তখনই ভগবান ডাণ্ডা মেরে দিল।
—আমরা তো মনেপ্রাণে প্রার্থনা করতাম, কাকি চলে যাক, কাকি এবার চলে যাক।
—রিয়েলি, ওরকম ভেজিটেবল বনে যাওয়াটা কি বেঁচে থাকা?
—পুরো ভেজিটেবল কোথায়? কাকির তো সেন্স ছিল, ইভন্ ইন দ্যাট হ্যাপলেস সিচুয়েশান। সেটাই তো আরো প্যাথেটিক।
আঃ, কী আরম্ভ করল এরা? এসব কি এখন আলোচনা করার সময়? মা কী ছিল আমার জন্য কত করেছে, সব তো অনেক পুরনো কথা। সবাই জানে। আমিও জানি। আমিও প্রাণপণ চেষ্টা করেছি মার সেই ঋণ শোধ করার। সাধ্যের অতিরিক্ত করেছি। মার যখন স্ট্রোকটা হলো খরচার পরোয়া না করে মাকে নিয়ে ছুটেছি বড় নার্সিং হোমে। সেখান থেকে মা ফিরল জড়বস্তু হয়ে, তবুও কি আমি হাল ছেড়েছিলাম? টানা ছয় মাস ফিজিওথেরাপি, প্রথমে তিনটা মাস তো সকাল-বিকেল। এর সঙ্গে ডাক্তার, নার্স ও আয়া …। মা সন্তানকে ভালোবাসবে, তার জন্য প্রাণপাত করবে এ তো স্বতঃসিদ্ধ, কিন্তু আমিও কি মাকে কম ভালোবাসতাম? আমার উদ্বেগ ছিল না? নার্সিং হোমে কত রাত জেগেছি পরপর, অমুক নিউরোলজিস্টের কাছে যাচ্ছি, তমুক নিউরোলজিস্টের কাছে যাচ্ছি, তমুক নিউরোলজিস্টের কাছে ছুটছি। বিরল ওষুধ খুঁজতে ঘুরে বেড়াচ্ছি শহরময়…। এর পরও যদি মা সুস্থ না হয় সেটা তো মার কপাল। তবু চেতনা যেটুকু ফিরেছিল সেও আমার চেষ্টার জোরেই। আশ্চর্য, আমার এই চেষ্টার দিকটা কেউ বলে না।
নার্ভের মোটর সিস্টেম প্রায় অকেজো হয়ে গেলেও মার মস্তিষ্ক বেশ খানিকটা সচল হয়েছিল। ব্যাপারটা আমার নজরে আসে মাকে নার্সিং হোম থেকে ফিরিয়ে আনার মাস তিন-চার পর। চৈতন্য ফেরার প্রকাশ অবশ্য ছিল মাত্র একটাই। চোখে। আমাকে দেখলেই মার চোখ দুটো ঘুরতে থাকত। যেদিকেই যাই, ডাইনে-বাঁয়ে, জানালায়, দরজায়, মার চোখ অনুসরণ করছে আমাকে। হ্যাঁ, শুধু আমাকেই। সুপ্তি কত সেবা করেছে মার, গোগোল মামপি তো তাদের ঠাম্মার প্রাণ ছিল। অথচ ওদের দেখে মার দৃষ্টি কিন্তু ও রকম চঞ্চল হতো না।
প্রথম প্রথম আমার গা শিরশির করত। কতদিন মার মাথার পাশে বসে প্রশ্ন করেছি, কী দেখছ মা? কিছু বলবে?
মার দুই মণিতে অদ্ভুত এক কাঁপন জাগত তখন। যেন একটা ভাষা ফুটেও ফুটছে না। গোমরাচ্ছে।
ক্রমেই ওই দৃষ্টিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। পরের দিকে তো দিব্যি একটা খেলায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিল ব্যাপারটা। মাকে কেউ দেখতে এলেই বলত, ওই আলমারিটার পাশে গিয়ে দাঁড়া তো বাবলু, দেখি এবার চোখ কোনদিকে যায়। … খাটের পেছনে চলে যা, এবার আর চোখ তোকে খুঁজে পাবে না। … ওমা দ্যাখো দ্যাখো, বাবলু বেরিয়ে যাচ্ছে অমনি রেণুদির দৃষ্টিও … আহা রে, একেই বলে চোখে হারানো!
ইদানীং মার কাছে তেমন বসা হতো না। কী করব বসে থেকে? তা ছাড়া আমারও তো ছেলেমেয়ে বউ অফিস সংসার এসব আছে, না কী? তার মধ্যেও রুটিন করে যেতাম এক-দুবার। দাঁড়াতাম একটু, মার পালস দেখতাম, আয়ার কাছে হালহকিকত জেনে নিতাম। সম্প্রতি একটা প্রেসার মাপার যন্ত্রও কিনেছিলাম, নিজেই মেপে নিতাম, রক্তচাপ। কাঁহাতক আর ওইটুকুর জন্য রোজ রোজ দশ টাকা করে গোনা যায়! রমাটা একেবারে টিপিকাল আয়া, ওর শেখার ইচ্ছেও নেই, ওকে দিয়ে ওসব কাজ হয়ও না। অফিস বেরোনোর আগেও নিয়ম করে একবার উঁকি দিতাম মার দরজায়…
আজ কি দাঁড়ানো হয়েছিল? মনে পড়ছে না। মোজা না রুমাল কী একটা যেন খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তাড়াহুড়োয় বোধ হয় …। তুত, এত খুঁটিনাটি কি মনে রাখা সম্ভব? বিশেষ করে যে মানুষ দিনের পর দিন, মাসের পর মাস একইভাবে টিকে আছে তার সম্পর্কে?
আবার একটা ডেডবডি এলো। কাচের গাড়িতে। বয়স্ক মহিলা।
রনিদা যান্ত্রিকভাবে কপালে হাত ছোঁয়াল। আলগাভাবে বলল, আমাদের কপালটা ভালো।
ঘুরে তাকালাম, মানে?
—পিসিকে একেবারে জাস্ট টাইমে আনা হয়েছে। দেকছিস না, তার পরই কেমন লাইন পড়ে গেল! আর দশটা মিনিট দেরি করলে তোকে তিন ঘণ্টা বসে থাকতে হতো।
এমন একটা ভার মুহূর্তেও হাসি পেয়ে গেল। পঁচিশ মাস টানতে পারলাম আর তিন ঘণ্টায় কি-ই বা ফারাক হতো?
সন্তুদা আর দুলু কথা বলতে বলতে আসছে। পঞ্চাশ পেরিয়ে যাওয়া সন্তুদার এক আশ্চর্য গুণ আছে, আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব কারও মৃত্যুর খবর পেলেই সন্তুদা যেখানে থাক হাজির। কাজকর্ম পুরোপুরি না মেটা পর্যন্ত স্বেচ্ছায় সব দায়িত্ব তুলে নেবে কাঁধে। আজও টেলিফোন পেয়েই এসে পড়েছিল, বড় মাইমা আর রেখা বউদিকে সঙ্গে নিয়ে। এসেই ঝটপট সব বন্দোবস্ত করে ফেলল সন্তুদা। কাচের গাড়ি, ফুল-খই-ধুপ অগুরু …। মার বুকে গীতা রাখা হয়েছে কি না, খইয়ের ঠোঙায় খুচরো পয়সা দেওয়া হলো কি না, প্রতিটি খুঁটিনাটিতেই সন্তুদার খুব নজর। শ্মশানে পৌঁছেও চরকি খাচ্ছে অনবরত। করপোরেশনের ঘরে দৌড়াদৌড়ি, পুরুতের সঙ্গে দর কষাকষি …। আমি যখন আগুন হাতে মাকে প্রদক্ষিণ করছি তখনও সন্তুদা আমার পাশেপাশে।
সন্তুদার হাতে একখানা প্লাস্টিকের প্যাকেট। প্রবীরদাকে প্যাকেটখানা ধরিয়ে এলো আমার কাছে, বাবলু, তোদের কাপড়-জামা কেনা কমপ্লিট। প্রবীর বাবুর কাছে রইল, চান করে পরে নিস।
—এত ঠাণ্ডায় রাত্তিরে চান করবে কি? না না, একটু গঙ্গাজল ছিটিয়ে নিলেই হবে।
—আহা, আমি কি গঙ্গায় ডুব দিতে বলছি? বাড়ি গিয়ে তো করবে। কী রে বাবলু, পিসির জন্য এইটুকু পারবি না?
বটেই তো। এটুকুই তো করছি!
আমার মুখের ভাঙচুর লক্ষ করেনি সন্তুদা। ফের বলল, পিসির ডেথ সার্টিফিকেটটা এখন আমার কাছেই রইল, বুঝলি। তিন কপি জেরঙ্ করে দিয়ে দেব, যত্ন করে রাখিস। হারালে কিন্তু পিসির কিছু পাবি না।
হায় রে, পিসির যেন কত ধনদৌলত আছে! রিটায়ারমেন্টের সময়ে কুড়িয়ে-বাড়িয়ে যা পেয়েছিল তার সিংহভাগই তো গেছে ফ্ল্যাটে। বারণ করেছিলাম, শোনেনি। ও টাকা পুষে আমি কী করব রে বাবলু! বরং যতটা পারিস ক্যাশ দিয়ে দে, তোর ব্যাংক লোন তাহলে কম হবে! রাগ করিস কেন, তোর বাড়ি তো আমারও রে, তুই কি আর আমায় তাড়িয়ে দিবি! ব্যাস্, সঞ্চয় প্রায় সাফ। তাও যেটুকু তলানি পড়ে ছিল তাই দিয়ে নাতনির জন্য সোনার চেইন বানাচ্ছে, দুম করে গোগোলের নামে একটা ক্যাশ সার্টিফিকেট কিনে ফেলল …। ওসব না করে কিছু যদি রাখত, বিপদের সময়ে তাও কাজে আসত।
পল্টু দিপুরা কখন যেন ফিরে হলঘরে ঢুকেছিল। বেরিয়ে ডাকছে, বাবলুকে নিয়ে চলে আসুন। আমাদেরটা হয়ে গেছে।
সন্তুদা সঙ্গে সঙ্গে টানটান, আয় আয়। … বেশ তাড়াতাড়িই হয়ে গেল দেখছি।
রনিদা একদিক থেকে ধরেছে, অন্যদিক থেকে প্রবীরদা। আমাকে নিয়ে চলেছে মার ভস্মাবশেষের দিকে। এত জোরে হাত চেপেছে কেন? ভাবছে আমি পড়ে যাব? ভেঙে পড়ব?
হলঘর পেরিয়ে উঁচু জায়গাটায় উঠলাম। আগুনে যাওয়ার অপেক্ষায় চ্যাঙারিতে শায়িত পর পর চারটে মৃতদেহ, তাদের টপকে নামছি সিঁড়ি বেয়ে। চুল্লি থেকে বিকিরিত হচ্ছে তাপ। বিচিত্র এক ওমে শরীরটা উষ্ণ হয়ে যাচ্ছে আমার।
উষ্ণ? না হালকা?
আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
দুই
খাটে আধশোওয়া হয়ে চোখ বোলাচ্ছিলাম ফর্দে। পুরুতমশাই একটা লিস্ট ধরিয়ে গেছেন বটে। চাল ডাল তেল নুন সবজি ফুল ফল বেলপাতা কুশ তিল যব হরীতকী তিল ঘি মধু চিনি কলাপাতা পান সুপারি মসলা কী আছে, কী নেই। দানসামগ্রীর তালিকাও নেহাত ছোটো নয়। থালা বাটি গেলাস ছাতা চটি শাড়ি ঘড়া গামলা পিলসুজ …। লেডিজ চটির পাশে সাইজ লেখা আছে, ছাতাটাও রঙিন চাই, তাও খাট বিছানা বালিশ লেখেননি, মূল্য ধরে নেবেন। কতটুকু সাশ্রয় হলো কে জানে!
সব মিলিয়ে মোট কত লাগতে পারে? বাজেট ছাপিয়ে যাবে না তো? ব্যাংক থেকে শেষ ঝড়তি-পড়তি দশ হাজার তুলে নিয়েছি, প্রবীরদার কাছে চেয়েছি পাঁচ—কাজকর্ম, খাওয়া-দাওয়া সব এতে চুকবে তো? প্যান্ডেল নেবে তিন হাজার। ফ্ল্যাটবাড়ির শুধু ছাদটুকু ঘিরবে, তাও সাদা কাপড়, এর জন্য এত যে কেন চাইছে? চেয়ার-টেবিলে নয় শ … মেরেকেটে হাজার। শ্রাদ্ধের দিন নব্বইজনের মতো খাবে। নব্বই ইনটু ফিফ্টিফাইভ, মোটামুটি পাঁচ হাজার। মৎস্যমুখের দিন তিরিশ জন। আশি ইনটু তিরিশ মানে প্রায় আড়াই। সাকুল্যে হলো সাড়ে এগারো। কাজে নিশ্চয়ই হাজার তিনেকের বেশি পড়বে না। পরশু ঘাটকাজেও কিছু খরচা আছে। … মনে হয় টায়েটুয়ে কুলিয়ে যাবে। তেমন যদি হয় শ্রাদ্ধের দিন এক রকম মিষ্টি নয় কমিয়ে দেব। প্লেটপিছু পাঁচ টাকা বাঁচে। অর্থাৎ সাড়ে চার শ। একেবারে ফ্যালনা নয়। এভরি ফারদিং কাউন্টস।
আচমকা হাসি পেয়ে গেল। কী ছেলেমানুষি ভাবনা! কলসি দিয়ে লাখো মোহর গলে গেল, এখন কানাকড়ি বাঁচাতে পুটিংয়ের খোঁজ। শুধু নার্সিং হোমেই তো বেরিয়ে গিয়েছিল চল্লিশ হাজারের বেশি। ফিজিওথেরাপিস্টের পেছনে না হোক বিশ-বাইশ হাজার। প্রথম মাসখানেক দুবেলা দুটো নার্স ছিল। তারা কান মচড়ে এক শ কুড়ি এক শ কুড়ি দু শ চল্লিশ দুয়ে নিত প্রতিদিন। খরচায় উদ্ব্যস্ত হয়েই না ধাপে ধাপে নেমেছিলাম। দুটো নার্স থেকে রাতে নার্স দিনে আয়া, তারপর দুবেলা দুটো আয়া, শেষমেশ ওই রমা। মেয়েটা রাত-দিন থাকত, খাওয়া-দাওয়া নিত। তা নিক, মাইনেটা তো কম। মাসে দু-হাজার বাঁচানো চাট্টিখানি কথা নয়। এত সামলে, এত টেনেটুনেও প্রভিডেন্ট ফান্ডে লোন, কো-অপারেটিভে ধার …। শালা, ভাবতেই ইচ্ছে করে না। যা খসছে খসুক, এবার একবারেই চুকে যাক। আশা করি, আমি বা সুপ্তি কেউ ওভাবে পড়ে থাকব না। তেমন হলে মামপি গোগোল যে কী অভিশাপ দেবে!
সুপ্তি ঘরে ঢুকেছে। ঘটাং ঘটাং আলমারি খুলল। তাক হাতড়াচ্ছে।
—কী খুঁজছ?
—আরে দ্যাখো না, জ্বালিয়ে মারল।
—কে?
—রমা। শাড়ি শাড়ি করে আমায় পাগল করে দিল।
—দিয়ে দাও একখানা।
—একটা নয়, দু-দুটো দিয়েছি। মার শাড়ি। বললাম, সাদা খোল তো কী আছে, ছাপিয়ে নিস। মন উঠল না।
—কী চায়? বেনারসি?
—ওই রকমই কিছু পেলে ভালো হয়। সুপ্তি মুখ বেঁকাল, বলছে দিদার এত ময়লা ঘাঁটলাম, একটা সিল্কের শাড়ি অন্তত পাব না?
দুনিয়ায় নিজের প্রাপ্য সবাই বোঝে। রমার কী দোষ, আমার মা-ই কি ছেড়েছে? কর্তব্যের পাওনাটুকু উসুল করে নেয়নি?
বিরস মুখে বললাম, ঝুটঝামেলা হঠাও। দিয়ে দাও। ঈষৎ রংজ্বলা নিজের একটা মুরশিদাবাদী সিল্ক বার করে নিয়ে গেল সুপ্তি।
ফর্দখানা টেবিলে রেখে চিত হয়ে শুলাম। চোখটা আবার টানছে। শরীরে বেজায় ক্লান্তি। সকাল থেকে আজ ছোটাছুটিও গেছে বেশ। দুলুকে নিয়ে নেমন্তন্ন করতে বেরিয়েছিলাম। মানিকতলা শ্যামবাজার … উত্তর কলকাতার পাট চুকোলাম আজ। ফোনেই বলে দিয়েছি অনেককে, তবু এখনো তো কেউ কেউ আছে যারা মাতৃবিয়োগ ভারাক্রান্ত মুখটি না দেখতে পেলে সন্তুষ্ট হয় না। আড়াইটে নাগাদ বাড়ি ফিরে ঘি সহযোগে সেদ্ধভাত গলাধঃকরণ, ফলত যথেষ্ট টকে আছে গলা। এখনো।
তবে ক্লান্তিটা ঠিক অম্বলের জন্য নয়। এ শ্রান্তি যেন একটু অন্য রকম। ম্যারাথন দৌড় সাঙ্গ করে শেষ ফিতে ছোঁয়ার পর যেমনটা লাগে দৌড়বীরের, এ অবসাদ যেন সেই ধাঁচের। মাকে পুড়িয়ে আসার পর থেকেই শরীর একদম ছেড়ে গেছে।
চিন্তাটায় কটু গন্ধের আভাস আছে কি? ম্যারাথনাররা আমার মতোই শরীর নিংড়ে দৌড়োয় বটে, কিন্তু তাদের শেষ ফিতে ছোঁয়ার সঙ্গে কি মার মৃত্যুর তুলনা চলে? আমি কি প্রথম দিন থেকে ওই লক্ষ্যেই পৌঁছতে চেয়েছি? না না না না, কক্ষনো না। বরং উলটো পথেই তো দৌড়েছি, লড়াই করেছি মাকে বাঁচানোর জন্য। কায়মনোবাক্যে চেয়েছি মা সুস্থ হয়ে উঠুক, পুরোপুরি আগের মতো না হলেও হাঁটাচলা করুক, মোটামুটি একটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরুক। সর্বস্ব উজাড় করেও যদি সামান্যতম উন্নতি না হয়, তখন মানুষের কেমন লাগে? মনে হয় না কি রেসিংট্র্যাকটা ক্রমে ঘুরে যাচ্ছে, পার হচ্ছি একটা লম্বা প্যাঁচালো পথ? ঘেমে নেয়ে যাচ্ছি, জিভ বেরিয়ে যাচ্ছে, ক্যালোরি শেষ, তবু ছোটো। কাঁহাতক পারে মানুষ?
সুপ্তি আবার এসেছে, হাতে চা। টেবিলে কাপ রেখে খাটে বসল। লাল পাড় কোরা শাড়ির আঁচল দিয়ে খাটের বাজু ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, তোমার সন্তুদাই জিতে গেল।
ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম, কেন?
—আমাদের ইচ্ছেটার তো মূল্য রইল না। মার ঘরে তো কাজ হচ্ছে না।
—সন্তুদা তো ভুল কিছু বলেনি। মার ঘরটা তো সত্যিই ছোটো। ড্রয়িংহলে কাজ হলে সুবিধেই হবে, শ্রাদ্ধের সময়ে লোকজন বসতে-টসতে পারবে। … ডেকরেটারকে বলে দিয়েছি ফরাস পেতে দেবে …
—আমার কোনো কিছুতেই আপত্তি নেই। তবে আমার লাগছে কোথায় জানো? তোমার ওই সন্তুদার কথাবার্তায়। … পিসির ঘরটা খুপরি … এত চাপা … আলোবাতাস খেলে না … যেচে পড়ে এসব শোনানোর অর্থ কী? আমরা যেন ইচ্ছে করে মাকে অন্ধকূপে রেখেছিলাম।
সুপ্তির আহত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। ফ্ল্যাটে আসার আগে সুপ্তি বারবার বলেছিল, মা আপনি বড় ঘরটা নিন। মা কিছুতেই রাজি হননি। এক গোঁ—আমি একা মানুষ, ওই ঘরের আমার কী প্রয়োজন। বরং বড় ঘরটা তোরা নে, মাঝেরটায় বাচ্চারা একটু হাত-পা ছড়িয়ে থাকুক।
হাত নেড়ে বললাম, সন্তুদার কথা ছাড়ো। খেটেখুটে দিচ্ছে …। আমরা তো জানি, আমরা মার জন্য কী করেছি।
—সবচেয়ে ভালো হতো বাড়িতে কাজটা না হলে। ফ্ল্যাটের সোসাইটির পারমিশন নাও, এর সামনে হাত কচলাও, ওর চাট্টি কথা শোনো … আমার একদম পছন্দ হয় না।
—কী করা যাবে? চৈতন্যমঠ গৌড়ীয়মঠ হেনামঠ তেনামঠ—সবই তো ঘুরে দেখা হলো। কোত্থাও জায়গা নেই। বাপ-মাকে চিতায় চড়ানোর আগেই যে লোকে শ্রাদ্ধের জায়গা বুক করে ফেলে আমি কী করে জানব? … একদিক দিয়ে ভালোই হলো। কেউ বলতে পারবে না মঠে টাকা ধরিয়ে মার কাজ সেরেছি।
—যারা কথা শোনানোর তারা ঠিক শোনাবে। এই তো, তোমার খুকুদি আজ কায়দা করে কত কী বলে গেল।
—কী বলেছে খুকুদি?
—মাসিকে তোমরা ন্যাজাল ফিডিংয়ে রাখলে পারতে, এই রমাটমারা কি তেমন সাবধানে খাওয়াতে পারে …! ঠারেঠোরে বলতে চাইছিল আমরা মার ঠিক যত্ন নিইনি।
—বলুক গে যাক। আমরা তো জানি আমরা কী করেছি। কথাটা ফের মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, বাইরের লোকের কথায় কান দিয়ো না।
—লাগে। বুঝলে, লাগে। দুই বছর ধরে সংসারের সব খরচ কিভাবে কাটল করে গেছি। ছেলেমেয়ের ফল বন্ধ করে মাকে আঙুরের রস, বেদানার রস খাইয়েছি। পুজোর সময়ে একটার বেশি জামা দিয়েছি মামপি গোগোলকে? দেনায় দেনায় অন্ধকার … মাস গেলে কেটেকুটে কটা টাকা হাতে পাও সে খবর কেউ নেওয়ার চেষ্টা করেছে কখনও? শুধু ওপর থেকে আহা, উহু। আজ বাদে কাল মামপি নাইনে উঠবে, ওর জন্য একটা ভালো টিউটর রাখা দরকার, পেরেছি রাখতে? সেই তো ঢোকাতে হলো কোচিংয়ের গোয়ালে। সুপ্তি জোরে নাক টানল, সারাক্ষণ খালি চিন্তা মার হরলিক্স ফুরোল কি না, মার কমপ্ল্যান আছে তো …।
মাকে ছেড়ে কোথাও গিয়ে দু-দণ্ড তিষ্ঠাতে পেরেছি? নতুন মাসির বিয়ে হলো, আমি সকালে মুখ দেখিয়ে এলাম, তুমি বিকেলে। কেন? মার জন্যই তো! তার পরও তোমার জেঠিমা বলে গেলেন রেণুর যখন টান উঠল তখন তুমি বুঝি ছিলে না বউমা! বলো, শুনতে কেমন লাগে? বলো?
—বাদ দাও। যারা করে, তাদেরই সমালোচনা হয়। এ তো জানা কথা, আমারও একটা ছোট্ট শ্বাস পড়ল, নাও, চা খেয়ে নাও। জুড়িয়ে যাচ্ছে।
চোখের কোল মুছে একচুমুকে কাপ শেষ করল সুপ্তি। উঠে লাগোয়া বাথরুমটায় গেল একটু। বেরিয়ে শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করল, তুমি এখন কিছু খাবে?
সিগারেট ধরিয়েছি। কাঠি অ্যাশট্রেতে গুঁজে বললাম, কী খাব?
—ফল কেটে দিতে পারি।
—চা খেয়ে ফল?
—খানিকক্ষণ পরে খেয়ো।
—কত ফল খাব? বাদড়ও এত ফল খেতে পারে না।
সুপ্তি ফিক করে হেসে ফেলল, তোমার টুসিদি সকালে আবার একগাদা কলা, আপেল, সফেদা দিয়ে গেছে। গোগোল মামপি তো দেখছে আর আঁতকে আঁতকে উঠছে, যে আসছে হাতে ফল, মিষ্টি, যে আসছে হাতে ফল মিষ্টি … গোগোল, চুরি করে সন্দেশ খেত, এখন ফ্রিজের ধার মাড়াচ্ছে না।
—ফেলে দাও সব। কাজের লোকদের বিলিয়ে দাও।
—কত দেব?
—তাহলে নিজেই খাও বসে বসে। তুমি তো আপেল ভালোবাস।
—বাসতাম। এখন আর সহ্য হয় না।
—তাহলে এক কাজ করো। ফলকো গোলি মারো। মামপি গোগোলের জন্য তো লুচি হবেই, কটা বেশি করে ভাজো। বেলায় খেয়ে, এখন আর কিছু না খেয়ে আমরাও বরং তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়াটা …
—তুমি লুচি খাবে?
—কী আছে? গোমাংস তো খাচ্ছি না।
—হ্যাঁ অ্যা, হুট করে তোমার কোনো আত্মীয় এসে পড়ুক, ওমনি রটে যাবে শাশুড়ি গত হওয়ার আনন্দে সুপ্তি বরকে লুচি গেলাচ্ছে।
—হু কেয়ারস্? আমরা কারো খাই, না পরি? অশৌচ মানামানিটা নিজেদের মনের ব্যাপার। তাও তো আমি … নেহাত মা এসবে বিশ্বাস করত বলে … এসব কাছা নেওয়া-টেওয়া আমার যথেষ্ট অকোয়ার্ড লাগে।
—আহা, পালন যখন করছই, পুরোটাই করো। আর তো মাত্র কটা দিন। এত দিন এত কিছু করলে আর মাত্র দু-চার দিনের জন্য ধৈর্য হারিয়ে ফেলবে?
ক্যাঁ ক্যাঁ ডোরবেল বাজছে। একটানা। নির্ঘাত মামপি। স্কুল থেকে এসেই ছুটেছিল কোচিংয়ে, ফিরল। গোগোল দরজা খুলতেই শুরু হয়ে গেছে লণ্ডভণ্ড কাণ্ড, ধুপধাপ আওয়াজ ড্রয়িং ডাইনিং স্পেসে। গোগোলের চিৎকার উড়ে এলো, মামপির হিহি হিহি।
চোখ কুঁচকে বললাম, কী নিয়ে লাগল দুজনের? এত হল্লা কিসের?
—আর কী! গোগোল কার্টুন চ্যানেল দেখছিল। মামপি নির্ঘাত ওর হাত থেকে রিমোট কেড়ে নিয়েছে।
ঠাম্মার মৃত্যুর পর দু-চার দিন থমকে ছিল ভাইবোন, আবার তারা সমে ফিরছে। গোগোলের স্বর চড়তে চড়তে সোপ্রানোয়, পাল্লা দিয়ে বাজছে মামপির হাসি।
সুপ্তি বিরক্ত মুখে বলল, দাঁড়াও দিয়ে আসি ঘা কতক। এত ধাড়ি মেয়ে, পাঁচ বছরের ছোট ভাইয়ের সঙ্গে কেমন লাগে দ্যাখো।
—থাক, কিছু বোলো না। মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ফ্ল্যাটটায় প্রাণ ফিরুক। এ কদিনের দমচাপা ভাবটা কাটুক একটু।
সুপ্তি অস্ফুটে বলল, এ কদিন? না পঁচিশ মাস?
বলেই সুপ্তি নীরব। আমিও আর কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বাইরে বিকেলটা মরে গেছে বহুক্ষণ, আমাদের বন্ধ দরজা-জানালা ভেদ করে মরা বিকেলটা তবু ঢুকে পড়ছিল ফ্ল্যাটে। চুঁইয়ে চুঁইয়ে।
তিন
আজ নিয়মভঙ্গ ছিল। ভালোয় ভালোয় চুকে গেল সব কাজ।
নিমন্ত্রিতরা প্রায় সবাই এসেছিল। দু-তিনজন ছাড়া। চন্দন আর চন্দনের বউ শেষ মুহূর্তে আটকে গেল। ওদের বাচ্চাটা নেহাতই দুগ্ধপোষ্য, সকাল থেকে বমি পায়খানা করে ভাসাচ্ছে। আর এলো না সন্তুদার বউ। শুক্রবার তার কী সব তন্তোষী মা-ফা থাকে, এদিন বাড়ির বাইরে তার খাওয়া নিষেধ।
খাওয়া-দাওয়ার পর দুপুরে আড্ডা হলো জমিয়ে। এ-প্রসঙ্গ, সে-প্রসঙ্গ, এ-কথা সে-কথা। রনিদা আজ ন পিস্ তপসে মাছের ফ্রাই খেয়েছে, সন্তুদা চোদ্দোখানা রসগোল্লা,—বেচারা ক্যাটারারের মুখটা কেমন আমসি হয়ে গিয়েছিল বলতে বলতে টুসিদি খুকুদির কী হাসি। ব্যাস, চলতে লাগল খাওয়ার গল্প। কে কোন নেমন্তন্ন বাড়িতে কোন সিঁটকে প্যাংলাকে আশি পিস মাছ খেতে দেখেছে, কোথায় কে কবে চার হাঁড়ি দই শেষ করেছিল, কার বাড়িতে বরযাত্রীরা নুন মাখিয়ে খেয়ে পুরো মিষ্টি সাবাড় করে দিয়েছিল, এসব। সন্তুদার স্টকে প্রচুর মড়া পোড়ানো স্টোরি, গুছিয়ে গুছিয়ে ছাড়ল কয়েকখানা। তার মধ্যেই মার কথাও উঠছিল হঠাৎ হঠাৎ, শ্রাদ্ধের দিনের মতোই। কলরোল রঙ্গরসিকতার মাঝে চাপাও পড়ে যাচ্ছিল মা। এমনই হয় বোধ হয়। শ্রাদ্ধের আড়ম্বরে মৃত মানুষটা ফিকে হয়ে যায় অনেকটাই। শোক থাকলেও তা তেমন প্রকট হওয়ার সুযোগ পায় না।
আসর ভাঙল সন্ধ্যের মুখে। একে একে বিদায় নিল সবাই।
যাওয়ার সময়ে খুকুদির বর বলল, বুঝলে বাবলু, আমার মনে হয় এবার তোমাদের কটা দিন একটু বাইরে ঘুরে আসা উচিত।
খুকুদি বলল, হ্যাঁ রে, পারলে কোথাও থেকে বেড়িয়ে আয়। মাসির জন্য তোদের যা অবস্থা গেল …। শরীর-মন দুটোই চাঙ্গা হওয়া দরকার।
যেতে পারলে তো ভালোই হতো। রোগী-রোগ, ওষুধ ও ডাক্তার করতে করতে সত্যি তো হাঁপিয়ে উঠেছি। কিন্তু এক্ষুনি, এক্ষুনি বেরোই কী করে? মা নেই বটে, কিন্তু ধারদেনাগুলো তো আছে।
উদাস মুখে বললাম, দেখি। কয়েকটা দিন যাক।
বাড়ি খালি হতেই হাতে রাশি রাশি কাজ। পরশু থেকে সোফা-টেবিলগুলো দেয়ালে ঠেলা রয়েছে, সন্তুদা যাওয়ার আগে কিছুটা টেনেটুনে দিয়ে গেছে, ধরাধরি করে ফেরালাম স্বস্থানে। রান্নাঘরে অবশিষ্ট খাবার-দাবারের ডাঁই, ছোট ছোট গামলায় ঢেলে খানিক ঢোকানো হলো ফ্রিজে। মাছ ভাজাগুলো বাইরেই রইল, শীতকালে কি আর পচবে? মেঝেটেঝেরও অকহতব্য দশা, মোটামুটি পদে আনতে হিমশিম খাওয়ার জোগাড়। মাঝে ক্যাটারিংয়ের লোকটাও এলো, হিসাবপত্র করে মিটিয়ে দিলাম তার টাকা। আটটা নাগাদ দুম করে চন্দন। বসব না বসব না করেও বসল একটুক্ষণ, জোর করে তাকে দুপুরের খাওয়াটা খাইয়ে দিল সুপ্তি।
রাতে অবশ্য আমি কিছু ছুঁলাম না। সুপ্তিও না। আঁশটে গন্ধে চতুর্দিক ম ম, গা গুলোচ্ছিল। মামপি গোগোলও বেজায় ক্লান্ত, গোগোল তো সন্ধে থেকেই ঢুলছিল, চন্দনের সঙ্গে বসে যৎসামান্য খেয়ে দুই ভাইবোনই বিছানায় ধপাস।
শোয়ার আগে সোফায় বসে সিগারেট টানছিলাম। সামনে টিভি চলছে, স্পোর্টস চ্যানেল। উত্তেজক এক ফুটবল ম্যাচ হচ্ছে, সম্ভবত স্প্যানিশ লিগ। শব্দ কমিয়ে পর্দার দিকে তাকিয়ে আছি, দেখছি না কিছুই। মাথাটা কেমন জ্যাম হয়ে গেছে। কদিন ধরে যা দৌড়ঝাঁপ গেল।
সুপ্তি মামপি গোগোলের ঘরে মশারি টানাতে গিয়েছিল। পাশে এসে বসল। তার চোখও খানিকক্ষণ পর্দায় স্থির।
হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, বাড়িটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেল, না?
কথাটা ঠিক বোধগম্য হলো না। ফাঁকা কেন বলছে? কদিন বাড়িতে ভিড় লেগে ছিল, তাই?
সুপ্তি আবার একটা শ্বাস ফেলল, যেভাবেই থাক, তবু তো মা ছিলেন।
—হুঁ।
—তোমার আর কী, অফিস চলে যাবে। একা বাড়িতে আমার যে কী করে কাটবে!
—হুঁ।
—খুকুদি তখন ঠিকই বলছিল। আমাদের কোথাও থেকে ঘুরে আসা উচিত। বেশি দূরে নয় নাই গেলাম, কাছাকাছি যাওয়াই যায়, কী বলো? এই ধরো দিঘা কিংবা পুরী কিংবা ঘাটশিলা মধুপুর …
—বুঝলাম। কিন্তু টাকা আসবে কোত্থেকে?
—আর অত টাকা টাকা করে মাথা খারাপ কোরো না তো। সুপ্তি দু-এক সেকেন্ড চুপ থেকে গলা নামাল, মার খরচটা তো কমে গেল… তা ছাড়া এক্ষুনি তো আর যাচ্ছি না, মামপি গোগোলের পরীক্ষাটা হোক, গরমের ছুটি পড়ুক …
টিভিতে একটা গোল হলো এইমাত্র। কৃষ্ণকায় গোলদাতা জার্সি খুলে ফেলেছে, বিপুল উৎসাহে খালি গায়ে দৌড়োচ্ছে মাঠময়। দর্শকরা পতাকা নাড়ছে। ভেঁপু বাজাচ্ছে, ক্যানেস্তারা পেটাচ্ছে আনন্দে।
রিমোট টিপে টিভি অফ করে দিলাম। শব্দহীন শব্দটাও উধাও। অদ্ভুত এক নৈঃশব্দ্য নেমে এসেছে হঠাৎ। ডাইনিং স্পেসে ফ্রিজটা গোঁও করে উঠল। গোঙাতে গোঙাতে সে আওয়াজও বোবা হয়ে গেল আচমকাই।
সুপ্তি উঠে দাঁড়িয়েছে। হাই তুলতে তুলতে বলল, শোবে না?
—চলো। যাচ্ছি।
দু পা গিয়েও ফিরে এলো সুপ্তি। বলল, একটা কথা ভাবছিলাম, বুঝলে?
—কী?
—তোমার তো সোমবার থেকে অফিস, কাল-পরশুর মধ্যে … ভাবছিলাম ঘরগুলোকে একটু রিওরিয়েন্ট করব।
—কী রকম?
—মামপি গোগোল একসঙ্গে থাকলেই ঝগড়া হয়, মামপির পড়ার জায়গাটা আলাদা করে দিলে হয় না? ধরো যদি মার ঘরে …
—মামপি মার ঘরে একা থাকতে পারবে?
—আহা, থাকার কথা কে বলছে? টেবিল-চেয়ার পেতে ওটা যদি ওর স্টাডিরুম করে দিই …
ওখানে টেবিল ঢুকবে?
—মার কিছু জিনিস যদি ও ঘর থেকে বার করে দেওয়া যায় … ধরো, মার সেলাই মেশিনটা, ছোট মিটসেফটা, ডাউস আলনাটা … আমি অনেকটাই সাফসুতরো করেছি, আরো কিছু মাল যদি …
—আঃ সুপ্তি! মানুষটা এখনো ওপারে পৌঁছল কি না ঠিক নেই …
স্বরে বুঝি আমার ঝাঁজ ফুটেছিল একটু। সুপ্তি থমকে গেছে। ভার ভার গলায় বলল, আমি অত ভেবে বলিনি। স্যরি।
—ঠিক আছে। দেখব কী করা যায়।
সুপ্তি তবু ম্লান মুখে দাঁড়িয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর চলে গেল শুতে।
আবার একটা সিগারেট ধরালাম। হাত বোলাচ্ছি মুণ্ডিত মস্তকে। সুপ্তি খারাপ কী বলেছে? সত্যি তো, মার ঘর তো আর চিরকাল খালি পড়ে থাকবে না, আজ নয় কাল মামপি গোগোল কেউ একজন দখল নেবেই। এক্ষুনি এক্ষুনি অবশ্য পারবে না, ভয় পাবে। থাক, দু-চারটে মাস যাক। তারপর নয় পুরনো খাট-আলমারি সরিয়ে, দেয়াল-টেয়ালের রং ফিরিয়ে নতুন চেহারা দেওয়া যাবে ঘরখানাকে। আপাতত সুপ্তি যা চাইছে …
ভাবতে ভাবতে কখন উঠে পড়েছি। পায়ে পায়ে এসে দাঁড়িয়েছি মার দরজায়। চিন্তাটাকে মাথায় নিয়েই ঘরের আলো জ্বালালাম।
সঙ্গে সঙ্গে বুকটা ছ্যাঁত। মা একেবারে আমার মুখোমুখি!
উঁহু, মা নয়। মার ছবি।
বেঁটে আলমারির মাথায় জ্বলজ্বল করছে বাঁধানো ফটোখানা। পরশু ছবিটা ফুলে ফুলে ঢেকে ছিল। আজ একটাই মোটা মালা। রজনী গন্ধার। সামান্য শুকিয়েছে ফুলগুলো, তবু একটা পলকা গন্ধ যেন বিছিয়ে রেখেছে ঘরময়। ছবির সামনে ধূপের ছাই, নিবে যাওয়া প্রদীপ।
কী অদ্ভুত রকমের জ্যান্ত ছবিটা! ঠিক মনে হয় সোজাসুজি আমার দিকেই তাকিয়ে!
সরে গেলাম একটু। আশ্চর্য, মার চোখও সরছে! ডান দিকে যাচ্ছি, বাঁয়ে …। আমার দিকেই ঘুরে ঘুরে যাচ্ছে মার দৃষ্টি! খাটের ওপাশটায় গিয়ে দাঁড়ালাম, চোখের মণি দুটো সেখানেও পৌঁছে গেছে! আলমারির পাশে চলে গেলাম, সেখানেও …।
অবিকল সেই বাঙ্ময় চোখ! আমাকেই দেখছে! শুধু আমাকে।
গা ছমছম করে উঠল। প্রাণপণে যুক্তি সাজানোর চেষ্টা করছি। এটা তো স্রেফ ছবি। ফটো। আমারই তোলা। ক্লোজআপ। মামপির পাঁচ বছরের জন্মদিনে। কারেন্ট কোনো সিঙ্গল ফটো নেই বলে এটাকেই এনলার্জ করে শ্রাদ্ধের জন্য বাঁধিয়ে দিয়েছে সন্তুদা। এ ছবি তো কদিন ধরে বারবারই দেখছি। লেন্সের দিকে সরাসরি তাকালে সব চোখই এরকম লাগবে …।
নাহ্, এ আমার মনেরই ভুল।
নিজেকে খানিকটা স্থিত করে আলো নিবিয়ে দিলাম। বেরিয়ে আসছি, হঠাৎই স্পষ্ট ডাক, বাবলু …?
মার গলা! মারই গলা!
এও কি বিভ্রম? আমার পা মাটিতে গেঁথে গেল। সম্মোহিতের মতো বলে উঠেছি, কী হলো মা? কিছু বলবে?
চেনা স্বর কেমন দুলে দুলে গেল, আমায় মাপ করে দিস বাবলু। মৃত্যুটা যে আমার হাতে ছিল না রে।
আমূল কেঁপে গেলাম। এই কথাটুকু উচ্চারণ করার জন্যই কি ছটফট করত মা? মা কি আমার ভেতরটা টের পেয়ে গিয়েছিল?
ভীষণ কান্না পাচ্ছিল আমার। মার মৃত্যুর পর এই প্রথম।

1 comment:

  1. সুচিত্রা ভট্টাচার্য্য আমার অন্যতম প্রিয় লেখিকা । তাঁর লেখা ছোটগল্প সর্বদাই এক অন্যমাত্রা পায় । বাস্তবিক চিত্র গুলো অনবদ্য ফুটে ওঠে কলমের আঁচড়ে । আত্মজ তেমনি এক গল্প ॥

    ReplyDelete

কথামালা Designed by Templateism | Blogger Templates Copyright © 2014

Theme images by mammuth. Powered by Blogger.