Stories

নদীর ধারে বাড়ি -

ছোট্ট দুটো হলদে প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে এঘর থেকে ওঘর, ওঘর থেকে সেঘর। নদীর দিক থেকে হাওয়া আসছে। অশথ গাছের পাতায় আওয়াজ হচ্ছে ঝিরঝির ঝিরঝির। সামনের ঘাসছাড়া টুকরো মাঠটায় ধুলো উড়ে যাচ্ছে পাক খেয়ে। দোতলা বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে ভূতের মত।
ভূত নয়। বিরাট কোনো জানোয়ারের শরীরের মত। মরা। ছালচামড়া ঝরে ঝরে পড়ছে, হাড়গোড় কিছু ভেঙ্গেছে, কিছু পাথর হয়ে জমে বসেছে। কিম্বা, বিশাল একটা জাহাজের মত। যার কাজ ফুরিয়ে গেছে অনেকদিন আগে। নদীর দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে এখন দিনরাত শুধু ঝিমোচ্ছে আর ঝিমোচ্ছে।
সামনের ফালি মাঠটার নাম নাকি এককালে ছিল লন। নরম সবুজ ঘাসে ঢাকা ছিল, এদিকে ওদিকে সাজানো ফুলের কেয়ারি ছিল। মালী ছিল, দেখাশোনা করত। লনের চারদিক ঘেরা উঁচু পাঁচিল ছিল। রাস্তা থেকে লনে ঢোকার জন্য ছিল বিশাল সিং-দরোজা। এখন দেখলে বোঝা কঠিন। সে পাঁচিলের একটা ইঁটও পড়ে নেই কোত্থাও। মাঠের পারে পলেস্তারা-খসা সিং-দরোজার খাম্বাদুটো শুধু দাঁড়িয়ে আছে বোকার মত। যেন তালাভাঙ্গা সিন্দুক পাহারা দিচ্ছে দুই বুড়ো সেপাই।
সেপাই ছিল। সান্ত্রীও ছিল। টগবগে ওয়েলার ঘোড়া ছিল, ঘোড়ায়-টানা গাড়িও ছিল। থাকবে না? বাড়িটা যে লাটসায়েবের। এই নদীর পাড়ে এসে থাকবেন বলে বানিয়েছিলেন সাহেব। সে প্রায় দেড়শ বছর আগে। থাকতেনও এসে মাঝে সাঝে। আজকের চড়া-পড়া এই নদীর ধারে তখন শহর তৈরির প্রস্তুতি। তারপর একদিন ঝড়ের দাপটে, নদীর দাপটে সব ভেঙ্গেচুরে গুঁড়িয়ে গেল। শহরের স্বপ্নশুদ্ধ। প্রকৃতির খেয়াল। সায়েবসুবোর খেয়াল। পড়ে রইল শুধু সাহেবের মস্ত দুইমহলা প্রাসাদ। সাহেব আর আসেননি কোনোদিন।
সে দুই মহলের এক মহল ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে তাও কতদিন হয়ে গেল। ইঁট কাঠ কড়ি বরগা যা যা ছিল বেচে দেওয়া হয়েছে সব। জমি-বাড়ির ব্যবসা যারা করে, তাদের হাতে চলে গেছে জমি। ঘর উঠেছে সেখানে। ছোট ছোট একতলা, দোতলা। গাঁ-গঞ্জে একটু পয়সা-করা মানুষরা এসে সেখানে বাসা পেতেছে। লাল সিমেণ্টের মেঝে হয়েছে, বারান্দায় শুকোতে দেওয়া হয়েছে টিয়া-সবুজ রং-এর শাড়ি।
মাঠের চারদিকে ঝোপঝাড়। বাবলা গাছ কয়েকটা, বুনো ঝোপড়া, লতা। একদিকে তিনটে তালগাছ। আখাম্বা লম্বা হয়ে উঠে গেছে আকাশের দিকে। বাড়িটার চেয়েও উঁচু। গোড়াগুলো খুব কাছাকাছি। একসঙ্গে লাগানো প্রায়। তাদের থেকে খানিক দূরেই বুড়ো অশথ গাছটা। অনেকটা জায়গার ওপর ছায়া পেতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হালকা একটুকখানি বাতাস দিলেও পাতায় পাতায় মিষ্টি আওয়াজ। ঝিরঝির ঝিরঝির শব্দে ঝিম ধরে যায়। ছায়া নড়ে, রোদ্দুর নড়ে,আঁকিবুকি কাটে মাটিতে।
দোতলা বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে ভূতের মত। না, কাজ-ফুরোনো জাহাজের মত। নাকি মরা জানোয়ারের শরীরের মত, কে জানে। পুরোনো আমলের চুন-সুরকীতে গাঁথা মোটা দেওয়াল, বিশাল বিশাল ঘর, একেক তলায় এগারোটা করে। দেড়-মানুষ উঁচু উঁচু দরজার পাল্লায় ওপর থেকে নিচ অবধি খড়খড়ি দেওয়া। ঘরগুলোর সামনে টানা ঢাকা বারান্দা। সারি সারি খিলেনের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার কড়ি-বরগাওয়ালা ছাদ। সামনের দিকটায় গাড়িবারান্দা। তার দু দিকে দুই মস্ত খিলেন, সেখান দিয়ে যাতায়াত করত লাটসাহেবের চৌঘুড়ি। পরে, অনেক পরে, কে এনেছিল কে জানে, একটা মোটরগাড়ি থাকত সেখানে। যেমন তেমন গাড়ি নয়, বিলিতি গাড়ি, রোলস রয়েস। রাজা-রাজড়ায় চড়ে। পরাণ ঘোষকে তাতে করে মাঝে মাঝে গাঁয়ের রাস্তা দিয়ে যেতেও দেখেছে লোকে। পুরোন দিনের গাড়ি, কালো রং-এর, ইঞ্জিনের সামনেটা জালি-জালি গ্রিল দিয়ে ঢাকা। ভঁপ ভঁপ করে হর্ন বাজত। সে গাড়িও পরে পড়ে থেকে থেকে নষ্ট হয়ে গেল। গাড়ির তেলের খরচাই বা কে দেবে আর। সিটের গদি কেটে ইঁদুরে বাসা করল, দরজায় মর্চে পড়ে ভেঙ্গে ঝুলে পড়ল, তারপর পরাণই বোধহয় একদিন পুরোনো লোহালক্কড়ের দামে বেচে দিল সেটাকে।
বাড়িটার ভিতটা অদ্ভুত। গোটা দেওয়াল মাটির ভেতর থেকে তোলা হয়নি। তার বদলে সেখানেও পর পর তৈরি করা হয়েছে খিলেন। তার ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই এত্তবড় বাড়িখানা। সেকালে কোন ইঞ্জিনিয়ারের মাথায় এমন বুদ্ধি খেলেছিল কে জানে। জল-ঝড়ের দেশ, নদীর বাঁধ উপচে জল উঠে এলে কলকল করে বয়ে যেত নিচ দিয়ে। বাড়ির ক্ষতি হত না। সে জন্যই তো ঝড় আর নদীর দাপটে যখন ভেঙ্গেচুরে গেল শহর তৈরির স্বপ্ন, তখনও এ বাড়ির কিচ্ছুটি হয়নি। এ বাড়ির, আর পাশের বাড়ির। পাশের সেই বাড়ি ভাঙ্গা হয়েছে পরে, বিক্রি হয়ে গেছে ইঁট-কাঠ লোহা লক্কড়। সেও তো কত বছর আগেকার কথা।
বাড়িটার সারা গায়ে গাছ। বটগাছ শিকড় চালিয়ে দিয়েছে দেয়ালের ফাঁকে ফোকরে। ফুলে ওঠা শিরার মত শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে কিছু শিকড় নেমে এসেছে মাটি পর্যন্ত। আরও নানা রকম আগাছা এখানে ওখানে ঝুলে আছে। বাড়ছে। ছাদ ভর্তি ঘাস গজিয়ে আছে, চুলের মত। হালকা হাওয়ায় দুলছে। দেয়ালের পলেস্তারা খসে খসে পড়েছে। কার্নিশের পাশে, থামের গায়ে অল্পই লেগে আছে কোথাও কোথাও, আবছা হয়ে আসা মনখারাপের মত । লাল লাল পাতলা ইঁটে নোনা ধরেছে অনেক জায়গায়। চুন-সুরকী ঝরে গেছে। গাড়িবারান্দার কোনার দিকের পিলারটা নিচের দিক থেকে খুবলে খেয়ে গেছে লোনা হাওয়ায়।
পিলারটাকে ডাইনে রেখে মস্ত খিলেনের মধ্যে দিয়ে ঢুকে পড়। কেউ আটকাবে না। সায়েবের চৌঘুড়ি যেখানে এসে দাঁড়াত, অধৈর্য ঘোড়াগুলো যেখানে পা ঠুকত মাটিতে, চামরের মত লেজের ঝাপটায় ডাঁশ-মশা তাড়াত, সে জায়গার ঠিক ওপরেই ধসে গেছে ছাদের অংশটা। লম্বাটে ফোকরের মধ্যে দিয়ে ঝুলে পড়ছে ঘাস, বুনো গাছের ডালপালা। উল্টোদিকের খিলেনটা ভেঙ্গে পড়েছে কবে। কড়িবরগার টুকরো ঝুলে রয়েছে বিপজ্জনক ভাবে। বাঁদিকে বারান্দায় ওঠার ছোট্ট দুধাপ সিঁড়ি। তার ঠিক পাশে পড়ে আছে কবেকার বাতিল করে দেওয়া কি এক মেশিনের কলকব্জা। জং-ধরা, ভারী দুটো লোহার চাকা লাগানো।
বাড়িটা বসে যাচ্ছে মাটিতে। ঝড় বাদলের সময় মেঝের নিচে যে সব খিলেনের মধ্যে দিয়ে বয়ে যেত নদীর হাওয়া আর জলের স্রোত, সেগুলি আর দেখাই যায় না প্রায়। এখন সেখানে সারি সারি ঘুপচি কালো ফোকর, অন্ধ মানুষের চোখের কোটরের মত। সাপখোপের বাসা।
দু ধাপ সিঁড়ি উঠলে একতলার বারান্দা। ঘরগুলির সামনে দিয়ে চলে গেছে টানা -- উত্তর থেকে দক্ষিণে। খিলেনের মধ্যে দিয়ে ট্যারছা হয়ে রোদ এসে পড়েছে। ছায়া, আলো, ছায়া, আলো, আবার ছায়া। তিনটে কুকুরছানা খেলা করছে বারান্দায়। আর ছোট্ট দুটো হলদে প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে এঘর থেকে ওঘর থেকে সেঘর।
একতলার চারটে ঘর ভাড়া দেওয়া হয়েছে টাইগার প্রজেক্টকে। বেশিরভাগ সময় তালাবন্ধই থাকে ঘরগুলো। নাকি গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পাঁচ নম্বর ঘরটার ছাদ আধখানা ভেঙ্গে ঝুলছে। সে ঘরের দরজা খোলা। ভেতরে রাজ্যের ঝুল, ধুলোবালি, খসে পড়া ইঁট-কাঠ, পলেস্তারা। তার পরে দরজাটা সিঁড়িঘরের। তার একখানা পাল্লা নেই। ছ নম্বর সেই দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই ঝটপট করে উড়ে যায় পায়রা। বকবক আওয়াজ করে অস্বস্তিতে। ঘাড় হেলিয়ে তাকালে অনেক উঁচুতে দেখা যায় ছাদ। তার মাঝখানে ফোকর। কবে ভেঙ্গে পড়েছিল কে জানে। ফোকরের ওপর ঢেউ-টিন দিয়ে আড়াল করা। ফাঁক দিয়ে অল্প আলো চুঁইয়ে ঢুকছে। আধোঘুমের স্বপ্নের মত আলো। একটু ভ্যাপসা গন্ধ জায়গাটায়। সামনে তিন পা দূরে শুরু হয়েছে চওড়া কাঠের সিঁড়ি, কয়েকধাপ উঠে ল্যাণ্ডিং, তারপর হঠাৎ ডাইনে বাঁক নিয়ে সিঁড়িটা দোতলার দিকে চলে গেছে ধীরে সুস্থে।
সাত নম্বর দরজাটা আসলে ছ নম্বর ঘরের। তাতে আছে মাদুর-পাতা বিশাল একটা তক্তপোষ। কালচে হয়ে আসা পুরোনো পাঁচকোণা বেডসাইড টেবিলের ওপর একটা মাটির কুঁজো, আর বিশাল বেলজিয়ান আয়না লাগানো মেহগনি কাঠের একটা ড্রেসিং টেবিল। আর কিচ্ছু না। তক্তপোষটা এত বড় যে ডবল মাদুরে সবটা ঢাকে না। ড্রেসিং টেবিলের পুরু আয়নার কাচে রাজ্যের ধুলো জমে আছে, সামনে গিয়ে দাঁড়ালে নিজের মুখটা পর্যন্ত ভালো করে চেনা যায় না। এ ঘরে থাকে সন্ধ্যারাণী। পরাণের দিদি। বাতে অথর্ব। সারাদিনই প্রায় শুয়ে শুয়ে কাতরায়। এঘর থেকে ভেতরের দিকে যাওয়ার একটা দরজা আছে। সেখান দিয়ে মাঝে মাঝে নেমে আসে পরাণ। দিদির ওষুধ দিয়ে যায়। ভাত বেড়ে দেয়। খাবার আসে স্টেশনের কাছের একটা ভাতের হোটেল থেকে। রান্না করার তো কেউ নেই। এঁটো বাসনগুলো কোনোরকমে জল-সাবান বুলিয়ে পরাণই ধুয়ে রাখে।
আট নম্বর দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। কিন্তু বাঁদিকের পাল্লার ওপরের খড়খড়িগুলোর একটাও নেই আর এখন। ভেতরে উঁকি মারা যায়। সেখানে ঝুল, ধুলো, পায়াভাঙ্গা চেয়ার আর ভটভটি নৌকোর একটা মর্চে-পড়া ইঞ্জিন। এ ঘর থেকেও ভেতরে যাওয়ার দরজা আছে। সেটাও বন্ধ।
বাকি ঘর চারটে ভেতরের দিকে। দরজা বন্ধই থাকে। তালা দেওয়া।
একতলায় থাকে সন্ধ্যারাণী, দোতলায় পরাণ। বাইশখানা ঘর-ওয়ালা বাড়িতে এই দুটি প্রাণী। পরাণ বিয়ে করেনি। দিদির বিয়ে হয়েছিল কোনকালে পাড়ার লোকের মনে নেই। স্বামী মারা যেতে ফিরে এসেছে বাপের বাড়ি, সেও নয় নয় করে বছর পঞ্চাশ তো হবেই। বাপের বাড়ি। মানে সাহেববাড়ি। গাঁয়ে সেই নামেই জানে সবাই। পরাণ আর সন্ধ্যার বাপ জীবনলালও তার জীবনের বেশিরভাগটাই এই বাড়িতেই কাটিয়েছে। এসেছিল কেয়ারটেকার হয়ে। দেখাশোনা করত বাড়ির, মাইনে পেত বোম্বাইয়ের এক পার্শী কোম্পানির কাছ থেকে। লাটসাহেবের বাড়িদুটো সে কোম্পানি কিনে নিয়েছিল একশ বছরেরও বেশী আগে। বিশাল জায়গার ওপর এরকম বিশাল দুই বাড়ি, পুরোনো দিনের দামী আসবাব, জরিপের নানা যন্ত্রপাতি, প্রচুর বই আর কাগজপত্রে ঠাসা — হয়ত কোনোদিন কোনো লাভের আশা করেছিল তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে কোম্পানির মালিকানাও হাতবদল হল, আর নতুন মালিকদের বিশেষ উৎসাহ ছিল না কেয়ারটেকার রেখে এত দূরের দুখানা পুরোনো প্রাসাদের ঝামেলা সামলানোর। তারাই প্রস্তাবটা দিয়েছিল পরাণের বাপকে। ততদিনে জীবনলালও কিছু টাকাপয়সা জমিয়েছে। বোম্বাই থেকে আসা মাস মাইনে তো ছিলই, তাছাড়া পুরোনো জিনিসপত্রও মালিকদের অজান্তে বিক্রি হয়েছে মাঝে মধ্যে। জলের দরে বাড়িদুটো কিনে ফেলল জীবনলাল।
তবে কিনা সংসারে কেউ আসে কিনতে, আর কেউ আসে বেচতে। জীবনলালের বড় ছেলে বাঁচেনি বেশিদিন। তার ছেলেরা লায়েক হয়ে বিক্রি করে দিল দক্ষিণের বাড়ি। কদিনের মধ্যেই তারপর মুছে গেল লাটসাহেবের তৈরি দুইমহলার এক মহল। গাঁয়ের আর পাঁচটা পাড়ার সঙ্গে সে জায়গার কোনো তফাৎ রইল না আর। পরাণের বাড়ি কিন্তু রয়ে গেল। পরাণ আর সন্ধ্যারাণীর বাড়ি।

।। ২ ।।
বাড়িটায় বড় মায়া। নদীর হাওয়াটায় মায়া। বুড়ো অশথগাছের পাতায় ঝিরঝির আওয়াজে মায়া। মায়া আর কাটিয়ে উঠতে পারেনি পরাণ। নহলে তো কবেই বিক্রি হয়ে যেত এ বাড়িও। ভেঙ্গেচুরে ঘর উঠত খালি জমিতে। ছোট ছোট একতলা, দোতলা। টানাটানিও থাকত না আর। বাতের ব্যথা বাড়লে সন্ধ্যারাণী এই নিয়ে বকাবকি করে ভাইকে। পরাণ কখনো শোনে, কখনো শোনে না। এমনিতেই তো আপন মনে কত বকবক করে দিদি। একা একাই। বয়েস হয়ে রোগা কাঠির মত হয়ে গেছে সন্ধ্যার চেহারা। ছেলেবেলার লম্বা চুল হয়েছে টিকটিকির লেজ। কাঁচাপাকা সেই চুল ছোট্ট একটুখানি বড়ি খোঁপা করে বেঁধে রাখে মাথার পেছনে। মেজাজ খিটখিটে হয়েছে। কিন্তু কাকে আর দেখাবে মেজাজ। নিজেই বকবক বিড়বিড় করে যায় তাই। নদীর হাওয়ায় ভেসে যায় কথা।
গাঁয়ের লোকে বলে বাড়িটার নিচে নাকি একটা সুড়ঙ্গ আছে। এক সময় নাকি সুড়ঙ্গ দিয়ে জোড়া ছিল দুই বাড়ি। বাজে কথা। ছোটবেলা থেকে পরাণ খুঁজে দেখেছে। সুড়ঙ্গ নেই। চোরকুঠুরি নেই। গুপ্তধন নেই। শুধু কবেকার এক খেয়ালি সাহেবের স্বপ্ন ছড়িয়ে আছে বাড়িটা জুড়ে। তালাবন্ধ ঘরগুলির দরজার পেছনে, ঘোড়ার খুরের মত দেখতে মেহগনি কাঠের সেক্রেটারিয়েট টেবিলের দেরাজে, দেয়াল-জোড়া বিশাল বিশাল আলমারিগুলোর ভেতরে।
এ সব আসবাব একতলায় রাখেনি পরাণ। মানুষের বড় কৌতূহল। উঁকিঝুঁকি মারে, ঘরে ঢুকে দেখতে চায়। কখনো কখনো কেউ কেউ কিনেও নিতে চেয়েছে পুরোনো কালের জিনিস। পরাণের মন সায় দেয় নি। স্বপ্ন কি ব্যবসার জিনিস? নাকি টাকা দিয়ে তা কেনা যায়? গাঁয়ের লোকদের তাই ঘরে ঢুকতে দিতে আপত্তি পরাণের। আসেও না কেউ।
গাঁয়ের লোকের সঙ্গে মেশে না পরাণ। শহরের লোকের সঙ্গেও না। ভালবেসে তো কেউ আসে না। সবাই আসে যে যার ধান্দায়। আসবাব বেচো, কিনব। বাড়ি বেচে দাও, হোটেল বানাব। পরাণ দেবে না। সাফ বলে দিয়েছে দেবে না। কাউকে দেবে না, সে ফিলিম স্টারই হোক কি রাজনীতির নেতাই হোক। ছাদ থেকে জল ঝরুক, দেওয়ালে লোনা ধরুক — যাবে তো যাবে পরাণের যাবে, অন্যদের অত মাথাব্যথার কি আছে? কি আছে সে কথা পরাণ ভালই জানে। লোকের সঙ্গে তাই মেশে না সে। গায়ে পড়ে কেউ আলাপ করতে এলে দরজা থেকেই বিদেয় করে দেয়।
দিনে একটিবার শুধু বাড়ি থেকে বেরোয় পরাণ। অনাথের চায়ের দোকানে গিয়ে ছোট কাচের গ্লাসে লিকার চা খায়। ষাট পয়সা দাম দিয়ে বাড়ি চলে আসে। সপ্তাহে একদিন খবরের কাগজ কিনে আনে। সেটাই পড়ে সাত দিন ধরে একটু একটু করে। মাসে একদিন যায় পোস্টাপিসে। বাবার জমা রাখা টাকার সুদ তুলে আনতে। বেশ অনেক টাকাই জমিয়েছিল বাবা। এক সময় তার সুদে পরাণ নবাবের মত থেকেছে। চাকরি করতে হয়নি কোনদিন। কিন্তু সে টাকারও দাম কমেছে। বহুদিন আগেকার কথা মনের মধ্যে থাকতে থাকতে যেমন ফিকে হয়ে যায়, তেমনি কবে যেন আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে গেছে জীবনলালের জমানো টাকার দাম। পরাণ আগে গাড়ি চড়ত। গাড়ি চড়া বন্ধ হল। কলকাতার অনেক বড় বাড়িতে টেলিফোনের লাইন আসার আগে ফোন বসেছিল এ বাড়িতে। সে ফোনের লাইন কাটা গেল। সময় মত বিল দেওয়ার পয়সা জোটে না বলে বিজলির লাইনও কেটে দিল। সন্ধেবেলা দুটো বাল্‌ব জ্বালানোর জন্য রাস্তার উল্টোদিকে শীতলের টিনের-চাল বাড়ি থেকে একটা তার টানতে হয়েছে তারপর। একটা জ্বলে দোতলায়, একটা একতলায়। তাও অর্ধেক সময় কারেণ্ট থাকে না। কিন্তু মাসে মাসে পঁয়তাল্লিশটা টাকা গুণে দিতে হয় শীতলকে। আগে পাখাও ছিল। প্রত্যেকটা ঘরে। জীবনলাল লাগিয়েছিল। তারও আগে ছিল টানা পাখা। ওপরের একটা ঘরে এখনো রয়ে গেছে টানাপাখা ঝোলানোর রড। ইলেকট্রিক ফ্যানগুলো বিক্রি হয়ে গেছে আস্তে আস্তে। পরাণই বেচে দিয়েছে টানাটানির সময়। লাইনই কেটে দিয়েছে তো পাখা নিয়ে কি হবে? পাখা চালানোর জন্য শীতলকে পয়সা দেওয়ার রেস্তও পরাণের আর নেই। তাছাড়া, দরকারটাই বা কি? হু হু করে হাওয়া আসে খড়খড়ি-ভাঙ্গা জানালা দিয়ে। নদীর হাওয়া। ঝড়ের সময় তো সামাল দেওয়াই দায়। দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতে হয় জানালার পাল্লা। যে জানালাগুলো বেঁধে রাখার অবস্থাতেও নেই, সেগুলো আছড়ে আছড়ে এসে পড়ে ফ্রেমের ওপরে। ভেঙ্গে যদি নিচে পড়ে যায় কোনোটা, ঝড় থামলে পরাণ যত্ন করে তুলে এনে রেখে দেয় সেটাকে। পুরোনো আমলের সেগুন কাঠের পাল্লা। একা মানুষের পক্ষে তুলে আনাও কঠিন, এত ভারী।
ভারী মায়া পরাণের। বাড়িটার জন্য মায়া। বাড়ির গায়ে লেগে থাকা পুরোনো সব গল্পগুলোর জন্য মায়া। কত আশা করে এ বাড়ি বানানো হয়েছিল সে কথা সাহেবের ফেলে যাওয়া পুরোনো খাতায় পড়েছে পরাণ। কত লোকজন কত দিন ধরে খেটে লাটসাহেবের থাকার জন্যে তৈরি করেছিল দুই মহলা প্রাসাদ। শুধু কি প্রাসাদ? তার সঙ্গে তৈরি হয়েছিল রাস্তা, বসানো হয়েছিল লাইন, রেলগাড়ি ছুটবে সে লাইন দিয়ে। বানানো হয়েছিল বন্দর, দেশ বিদেশ থেকে জাহাজ এসে লাগবে সেখানে। স্বপ্নের সেই শহর আর বন্দর তৈরির জন্য কত হিসাব কেতাব, কত অঙ্ক, কত নকশা, কত ছবি। যন্ত্রপাতিই বা কত। সে সব এখনও ডাঁই হয়ে পড়ে আছে আলমারিতে, দেরাজে। মাঝে মধ্যে নামিয়ে দেখে পরাণ। বই-খাতাগুলো পড়ে, যন্ত্রপাতিগুলোতে হাত বোলায়। কত রকমের কত যন্ত্র। কাঠের, লোহার, পেতলের। সব বিলেতে তৈরি। পেতল দিয়ে বানানো লম্বা একটা টেলিস্কোপ আছে। গায়ে খোদাই করা বিলিতি কোম্পানির নাম এখনও পড়া যায় — লরেন্স অ্যাণ্ড মেয়ো। সে টেলিস্কোপ চোখে লাগালে কিছুই দেখা যায় না এখন। ছাতা পড়ে ঝাপসা হয়ে গেছে কাচ। একবার এক ক্যামেরার দোকানে জিনিসটা নিয়ে গিয়েছিল পরাণ, যদি সারানো যায়। দোকানদার বলল কলকাতা থেকে সাফ করিয়ে আনতে হবে লেন্স। কমসে কম পাঁচশ টাকার ধাক্কা। অত টাকা খরচ করার ক্ষমতা কি পরাণের আছে? পড়েই রয়েছে জিনিসটা তাই দোতলার ঘরের এক কোণে। একবার, অনেক বছর আগে, এক রিপোর্টার এসেছিল কোন খবরের কাগজ থেকে। টেলিস্কোপটা দেখে তার তো চোখ কপালে। বলে ও মশাই, শুধু এইটা বিক্রি করলেই তো যে পয়সা পাবেন তাতে বেশ কিছুদিন চলে যাবে আপনার। সে কথা পরাণ কি আর জানে না? কিন্তু বেচতে মন চায় না তার। থাক, যেখানকার জিনিস সেখানেই থাক।
রিপোর্টার অনেক এসেছে। এই বাড়ি নিয়ে কত গল্প লিখেছে, দেশে বিদেশে কত কাগজে ছাপা হয়েছে সে সব লেখা। লণ্ডনের টাইমস পত্রিকায় পর্যন্ত। সে লেখা বেরোনোর পর বিলেতের রাজবাড়ি থেকে চিঠি এসেছিল পরাণের কাছে। বুকটা দশহাত হয়ে গিয়েছিল গর্বে। মনে মনে আশা হয়েছিল হয়ত এবার বাড়িটা দেখভালের একটা ব্যবস্থা হবে। কিছু হয়নি। তার পরেও এসেছে রিপোর্টাররা। তাদের আর ঢুকতে দেয়নি পরাণ। কথাও বলেনি। দূর করে দিয়েছে দরজা থেকে। বাড়িটা রয়ে গেছে যেমনকে তেমন। একলা আর নিঝুম।

।। ৩ ।।
নদীর দিক থেকে অল্প অল্প হাওয়া আসছে। ফিসফিস ঝিরঝির করে নিজের মনে কথা বলছে বুড়ো অশথগাছ। বাড়িটা কান পেতে শুনছে। লম্বা টানা বারান্দাটায় সারি সারি খিলেনের ফাঁক দিয়ে ট্যারছা হয়ে এসে পড়েছে লালচে রোদ্দুর। বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে ভূতের মত। কিম্বা বিরাট কোনো জানোয়ারের শরীরের মত। মরা। শুধু ছোট্ট দুটো হলদে প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে এঘর থেকে ওঘর, ওঘর থেকে সেঘর।

কথামালা Designed by Templateism | Blogger Templates Copyright © 2014

Theme images by mammuth. Powered by Blogger.