Stories

মিথিলা সেওহারা ও সে -

কালো রোমশ মাকড়শাটাকে সে দেখেছিল বাথরুমে। কেমন ভয় জাগানিয়া। তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে। কয়েকদিন মাকড়শাটাকে দেয়ালের একই স্থানে দেখতে পেল। তারপর একদিন রোমশ কীটটাকে আর দেখতে পেলনা সে।
স্থান বদল করে চলে গেছে অন্যত্র। তার ছাতের এই বাসাটা সে ছাড়াও আরো হরেক রকম প্রাণির আস্তানা। বাথরুমের ছাত টিনের। দেয়ালের ওপর তক্তা ও টিনের ফোকরে বাস করে অজ চামচিকে, তাদের বিষ্ঠায় বাথরুমের বিস্কিটরঙা জীর্ণ দেয়াল কালো আলপনায় ছেয়ে গেছে। অহর্নিশ এদের কিচকিচ ডাক শোনা যায়। ঘরের বিবর্ণ দেয়ালে ঘুরে বেড়ায় অসংখ্য ঘাড়মোটা টিকটিকি। সমস্ত ঘরজুড়ে এদের এত খাদ্য যে, খেয়ে খেয়ে তারা শরীরের মেদ বাড়িয়ে চলেছে। আর তাদের টিকটিক ডাক রাতের নিস্তদ্ধতা ভঙ্গ করে। একজোড়া মৈথুনরত টিকটিকি দেয়াল আঁকড়ে কিরির-কিরির শব্দ করছিল। সে কাছিয়ে যেতে ওরা সরে যাবার চেষ্টা করল। দেয়ালের অপেক্ষাকৃত মসৃণ অংশে পিছলে গিয়ে থপ করে নিচে পড়ে দুজন দুইদিকে পালাল।
আর আছে আরশোলা, ইয়া বড় বড়। সারা বাসাজুড়ে তাদের বিচরণ। ওর জানালার কাছের আমগাছে বাস করে একজোড়া তক্ষক, টিকটিকির খালাত বা চাচাত ভাই। তারা বাস্তু টিকটিকিদের চাইতে বনেদি। সেজন্যই বোধহয়, ঘর-প্রজাতি আর গাছ-প্রজাতির সাথে কোনো রকম যোগাযোগ নেই। গাছ প্রজাতি ডাকে টাক-কু শব্দে আর ঘর-প্রজাতি ডাকে টিকটিক করে।
একটা শিঙাল পেঁচাও আসে আমগাছটায়। কিন্তু ওকে কোনোদিন সে ডাকতে শোনেনি। বোধহয়, এই আমগাছটা ওর স্থায়ি নিবাস না, একটা ট্রানজিট। বহুদূরের যাত্রি সে, উড়ে উড়ে যায়। এই আমগাছে শোঁয়াপোকার রসালো আহার সেরে ফের উড়াল দেয় অজানা গন্তব্যে।
ঘরটায় আরো আছে অসংখ্য নেংটি ইঁদুর, তাদের দেখা যায়, কিন্তু ধরা যায়না। সুপারসনিক জেটের মতো তাদের গতি, স্প্রিংয়ের মতো ছুটে যাবার ভঙ্গি।
এদের নিয়েই আছে সে। আরেকটি প্রজাতির টিকটিকি আছে ওর আশেপাশে। তবে সে দেয়াল টিকটিকিও না বা গোয়েন্দা সংস্থার কেউ না। প্রথম প্রথম তাকে গোয়েন্দা বলে মনে হলেও আজকাল তাকে আর গোয়েন্দার পর্যায়ে ফেলা যায়না। কেননা, সে খুব খোলামেলা আচরণ করছে। গোয়েন্দারা যা সাধারণত করেনা। এই টিকটিকিটা নিচতলার বাসিন্দা। বিকেলে ছাতে খেলতে আসে।
কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরে এসে সে ক্যাকটাসের পরিচর্যা করে। ক্যাকটাসের সঙ্গে তার পুরনো সখ্যতা। সুযোগ পেলেই কাঁটাসমৃদ্ধ গোল ক্যাকটাস কিনে আনে। এদের পরিচর্যা করতে হয়না খুব একটা। বিকেলে তার কাজ থাকেনা বলে ক্যাকটাসের সাথে বিকেলটা কাটে। ছোটো টিকটিকি-মেয়েটার চুল বেণি করা থাকে আর তার গায়ের জামা রংচঙে। মেয়েটা শান্ত। নাম রূপসা। ছাতের রেলিং উজিয়ে রূপসা নিচে তাকিয়ে মানুষজন দেখে। ছাতঘেঁষে নারকেল গাছগুলোর কাকদের দিকে ঢিল ছুড়ে মারে। সে ক্যাকটাসের বালিমাটি খুঁচাবার অবসরে আড়চোখে মেয়েটিকে লক্ষ করে। মেয়েটি রেলিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়লে সাবধান করে। প্রথম কদিন পরিচয় পর্ব চলল। এরপর চলল চকলেট পর্ব। গত কিছুদিন সে নিয়মিত চকলেট নিয়ে আসছে মেয়েটির জন্য। প্রথম কদিন দ্বিধার সাথে চকলেট গ্রহণ করলেও এখন মেয়েটি রীতিমতো অপেক্ষা করে চকলেটের জন্য।
‘তোমার নামে একটা নদী আছে, জানো?’
‘হ্যাঁ।‘
‘সেই নদীতে শুশুক ডিগবাজি খায় দেখেছ?’
‘শুশুক কী?’
‘ছোটো ডলফিন। এরা একজাতের মাছ।‘
এভাবেই গল্পপর্ব চলে মেয়েটির সাথে। অন্যদিকে দুলতে থাকে পেন্ডুলাম। না, এটা অধুনাতন ঘড়ি নয়। দেয়ালে টানানো তাঁর শখের সেওহারা। ফ্রান্সের ল্যুভর মিউজিয়ামে সংগৃহিত হবার মতো দুর্লভ বস্তু।

অবিরাম টক টক শব্দ করে যায় ঘড়িটা। মাঝেমধ্যে ঢং ঢং শব্দে জানান দেয় তার অফিসে যাবার বা ঘুমাবার সময়। সেওহারা যখন ঢং ঢং শব্দ করে ওঠে তখন টিকটিকিরা দৌড়ে পালায়। ঘরের নীরবতায় একটা কাঁসার ধ্বনি তরঙ্গায়িত হয়। এক ব্রিটিশ সাহেব এই ঘড়িটা দাদাকে উপহার দিয়েছিল। দাদা সাহেবদের এক সওদাগরি অফিসে চাকরি করতেন। একসময় অফিসটি বন্ধ হয়ে যায়। সাহেবরা সবকিছু গুটিয়ে নিচ্ছিল ভারতবর্ষ থেকে। সাতচল্লিশের পর দাদা চলে এলেন ঢাকায়। আস্তানা গাঁড়লেন টিকাটুলিতে। জনসন রোডে তিনি ঘড়ির দোকান দিলেন। দূরদূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসত তাঁর দোকানে। নানান দেশের নানান জাতের ঘড়িতে গিজগিজ করত দোকান। অনেক দুর্লভ ঘড়িও ছিল তাঁর সংগ্রহে--সেওহারা তেমনি এক প্রজাতি। লোকজন ঘড়ি কিনতে বা সারাই করতে তাঁর দোকানে ভিড় করত। দক্ষতা, নিষ্ঠা ও সততা দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে একসময় ছেলের হাতে ব্যবসা তুলে দিয়ে দাদা একদিন চোখ বুজলেন। ছেলে সেই ব্যবসা ধরে রাখতে পারেনি। ব্যবসা মার খেতে খেতে একসময় বন্ধ হয়ে যায়। সবেধন নীলমণি হিশেবে সেওহারা ঘড়িটি আজও অস্তিত্বমান।
ঘড়ির ব্যবসা ছেড়ে সরকারি দপ্তরে যোগ দিয়ে সেখানে চাকরিজীবন কাটিয়ে অবশেষে পেনশন প্রাপ্ত হন তার বাবা। বাবার পথ ধরে সে-ও চাকরি নিল সরকারের এক দপ্তরে। সেই থেকে ভ্রাম্যমান সে। সমাজ কল্যাণ দপ্তরের কর্মকর্তা পদে যোগ দিয়ে আজ নয় বছর যাবৎ সে মানবসেবা করে যাচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সে চাকরি করেছে। বিভাগীয় শহরে করেছে, সর্বশেষ এই জেলা শহরে এসে ঠেকেছে। এখন আর পিছুটান নেই। বাবা গত হয়েছেন তিনবছর আগে, গত বছর মা-ও চলে গেলেন। একটা মাত্র ছেটোবোন স্বামী-সন্তানসহ জার্মানিতে দিন গুজরান করছে। এখন যদি কর্তৃপক্ষ তাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ের কোনো গুপ্ত গুহাতেও পোস্টিং দেয়, তাতেও সে আপত্তি করবেনা। মাসছয়েক আগে জার্মানি থেকে ছোটোবোন এসেছিল। বোন আর মগবাজারের মণি খালা উদ্যোগ নিয়ে একটা বিয়ের প্রস্তাব এনেছিল, কিন্তু সে রাজি হচ্ছিল না। তবুও ছোটোবোন ও মণি খালা আরো একটু এগিয়েছিল কিন্তু শেষমুহূর্তে পিঠটান দেয় সে। যার বারবার ট্রান্সফার হয়, যার বউ অস্তিত্বে এখনও মিশে আছে, বউয়ের মায়াভরা আদরের রেণু যার সর্বাঙ্গে এখনও লেগে আছে, প্রথম দাম্পত্য জীবনের দিনগুলো যার স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল, তার পক্ষে এখন বিয়ে করা সম্ভব না।
তার বিবাহিত জীবনের আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র সোয়া বছর। স্ত্রী মিথিলা চলে গেল। আঘাতটা সকরুণ রূপ ধরে ওর জীবনের সমস্ত আনন্দ যেন মাটিতে মিশিয়ে দিল। একটা চিরস্থায়ি দাগ এঁকে দিল ওর হৃৎপিণ্ডের গভীরে।
...ওদের বিয়ের মাত্র ছয়মাস পরেই তার ট্রান্সফার অর্ডার হয়ে যায়। চেনা পরিবেশ ছেড়ে সে দুইবছর পোস্টেড ছিল। মিথিলা ওর সাথী হতে চেয়েছিল, সে-ই না করেছিল--নতুন পরিবেশে ওদের সদ্যবিবাহিত জীবন গুছিয়ে ওঠার আগেই ফের ট্রান্সফার হয়ে গেলে সব এলোমেলো হয়ে যেত। মিথিলাও সেই যুক্তি মেনে নিয়েছিল। সে মাঝেমধ্যে উইকএন্ডে মিথিলাদের বাড়িতে চলে যেত। মিথিলা সবকিছু মেনে নিত। অথচ চাকরিটা বারবার ট্রান্সফারযোগ্য জেনেও সে মন থেকে তা মানতে পারেনি, বিশেষত বিয়ের পর। মিথিলাই ওকে সান্ত¦না দিত।
মাঝেমধ্যে সন্দেহ জাগত, মিথিলা কি সুখি নয়? সে কি ঘরসংসার চায় না! প্রশ্নটা একবার করেছিল সে। মিথিলা কাচভাঙ্গা হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘সব মেয়েই সংসার চায়। আমিও চাই। তাই প্রতীক্ষা করছি।’
‘কীসের প্রতীক্ষা!’
‘কীসের আবার, তুমি যখন এখানে বদলি হয়ে আসবে, তখন সংসার গুছিয়ে বসব।’
‘ফের যদি বদলি হয়ে যাই?’
‘আর বদলি হতে দেব না।’
‘মানে!’
‘মানে হলো তোমাকে এই চাকরি থেকে ছাড়িয়ে নেব। তুমি বলেছিলে তুমি নাকি অনেক এনজিও থেকে অফার পাচ্ছ।’
‘তা পাচ্ছি।’
‘আর আমি একটা কলেজে ঢোকার চেষ্টা করছি...দু’জনে মিলে সংসার গড়ে তুলব।’
সে মুগ্ধচোখে মিথিলার দিকে তাকিয়ে ছিল। রেললাইনের ওপারে নারকেল গাছের মাথায় মস্ত চাঁদ উঠেছিল সেরাতে। ছাতে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল সে মিথিলার সাথে।
তার শ্বশুরালয়, মানে মিথিলাদের বাসাটা ভারি সুন্দর। খুলনা শহরের খালিশপুরের সব বাড়িগুলোই কমবেশি সুন্দর। কারণ এলাকাটা সুন্দর। প্রশস্ত পাকা রাস্তা, দু’পাশে সারি সারি গাছ। পাকা রাস্তায় হেঁটে বেড়ায় সোনালি ভেড়ার দল। রাজহাঁস ক্রং ক্রং শব্দে গলা উঁচিয়ে রাস্তা পেরোয়। ক্রেসেন্ট রোডের শেষপ্রান্তে একটা পুকুর ঘেঁষে মিথিলাদের বাড়ি। পুকুরের ওপারেই রেললাইন। প্রতিবার ট্রেন যাবার সময় আশপাশ প্রকম্পিত করে যায়। বিশাল জায়গার ওপর উঁচু বাউন্ডারি ঘেরা বাড়ি। বাগান ও গাছগাছালিতে ভরপুর।
সে বলেছিল, ‘না হয় মানলাম, কলেজে তোমার চাকরি হলো। কিন্তু কোন্ কলেজে? আর আমার এনজিও’র চাকরির অফার তো ঢাকায়। তোমার আমার কর্মক্ষেত্র যদি না-ই মিলল তাহলে তো যে লাউ সেই কদু হয়ে যাবে।’
‘বুঝেছ ছাই,’ মিথিলা বিন্দুমাত্র দমিত না হয়ে বলল, ‘আমার চাকরিটা খুলনাতেই হতে পারে।’
‘তাহলে আমি নেই,’ সে বলল, ‘আমি বাবা ঢাকা ছাড়া অন্য কোথাও পারমানেন্টলি থাকতে পারবনা। আর এনজিও’র চাকরিটা নিলে ওরা আমাকে ঢাকাতেই রাখবে বরাবর। তুমি কেন কলেজের চাকরির জন্য ঢাকায় চেষ্টা করো না? আর কলেজে কি তোমাকে নিতান্তই চেষ্টা করতে হবে? আমার একার বেতনে চলবে না? এনজিওতে জয়েন করলে বেতন বেশি পাব বলেই মনে হয়। তাতে কি আমাদের দু’জনের চলবে না?’
মিথিলার মুখটা কি কালো হয়ে গেল। মিথিলা বলল, ‘চলবে হয়তো, কিন্তু...। মানে বাবা বলছিলেন, তাঁর এনজিওটা যদি তুমি দেখাশোনা করো, আর আমিও এখানকার কলেজে যোগ দিই।’
সে ঘাড়ের কাছটা চুলকে বলল, ‘তা সম্ভব নয় মিথিলা। শ্বশুরের এনজিওতে চাকরি করে বেতন নিতে পারব না। আর বেতন না নিলে আমার জীবন চলবে না।’
‘শুধু বেতনের কথা তুলছো কেন। বাবা চাচ্ছেন নিজেদের কারুর ওপর দায়িত্ব দেবেন তিনি। ভাইয়া তো হঠাৎ করেই অ্যামেরিকায় চলে গেল। নইলে ভাইয়া হাল ধরতে পারত এনজিওটার। তাই...।’
‘কিন্তু মিথিলা, তা সম্ভব নয়। আমি চাকরিসূত্রে ঢাকার বাইরে হলেও জন্মসূত্রে কিন্তু ঢাকাইয়া। আমার পক্ষে ঢাকা ছাড়া স্থায়িভাবে আর কোথাও সেটল করা সম্ভব না। আরো একটু সমস্যা আছে, শ্বশুরের প্রতিষ্ঠানে আমার পক্ষে যোগদান করা একেবারেই অসম্ভব।’
মিথিলা বলা নেই কওয়া নেই, সহসা গটগট করে ছুটে গেল সিঁড়িঘরের দিকে। তারপর ঠকঠক শব্দে নেমে গেল সিঁড়ি বেয়ে। সেদিকে তাকিয়ে আপনমনে হাসল সে। মিথিলার আশা ভঙ্গ হয়েছে। আগে থেকেই এরকম কিছু ঠাওর করে আসছিল সে--গত দুইদিন বাপমেয়েকে ফুসুর-ফাসুর করে শলাপরামর্শ চালাতে দেখেছে। এক্ষণে তার দুইদিনের শলা নিমেষে চুরমার হয়ে গেল বিধায় মিথিলা তার রোষ চেপে রাখতে পারেনি। এইসাথে মিথিলার কোন্ স্থানটায় চোট লেগেছে বেশি, সেটাও খোলাসা হয়ে গেল। ওর বাপের এনজিওতে যোগদান করতে না চাওয়াটা মিথিলার ভালো লাগেনি।

পরের ক’টি দিন ওদের মান-অভিমানে কাটল। সেদিন সে শ্বশুরের ওপর বিরক্ত হলো রীতিমতো। চায়ের টেবিলে শ্বশুর ইনিয়েবিনিয়ে অনেক কথা বলে শেষে ওই এক কথাই বললেন। বয়রার জায়গাটা ওর নামে লিখে দেবেন এবং মা-মরা মেয়েটার জন্য ব্যাংকে প্রচুর টাকা রেখে দেবেন বলে জানালেন আর তাঁর এনজিওতে যোগ দিলে যে আখেরে ভালো হবে--সে কথাও জানালেন। তারপর জামাই পটে গেছে--এমন একটা ভান করে তিনি ‘কালই লেগে যাও’ বলে বিশাল হাই তুলে বললেন, ‘কইরে মিথিলা, দুপুর তো পার করে দিলি। জামাইয়ের সাথে আমার খাবারটাও দিয়ে দে।’
সে বিরক্ত হয়েছিল, তবে তা প্রকাশ করেনি। এখন সেটা প্রকাশ করে বলল, ‘কিন্তু আমার পক্ষে আপনার প্রস্তাবে রাজি হওয়াটা সম্ভব নয়।’
হে-হে করে হেসে শ্বশুর বললেন, ‘শ্বশুর কি কখনও জামাইকে প্রস্তাব দেয় নাকি। এটা হলো, যাকে বলে--বুড়ো শ্বশুরকে একটু রিলিফ দেয়া। মা-মরা মেয়েটার গতি করা।’
সে বলল, ‘আমি অন্য যে কোনো ভাবে শ্বশুরের প্রতি কর্তব্য পালন করতে পারি, রিলিফ দিতে পারি আপনাকে। কিন্তু এভাবে নয়...।’
‘ঠিক আছে, তোমার যা ভালো মনে হয় করো,’ শ্বশুরের কন্ঠে উষ্মা প্রকাশ পেল।
পরের দিনটি মিথিলা ওর কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ালো। তারও পরের দিন তার যাবার সময় হয়ে গেল। জিনিসপত্র গোছগাছ করছিল সে। এসময় গুটি গুটি পায়ে সামনে এসে দাঁড়ায় মিথিলা। চোখদু’টো ফোলা, অবিন্যস্ত চুল, মুখ শুকনো। সে বলল, ‘কী হয়েছে প্রেয়সী। না না, তোমার এই মলিন মুখখানি আমি সইতে পারছি না। এই শুকনো মুখ চুমোয় চুমোয় ভিজিয়ে দেব। আমি সেইদিন হবো শান্ত, যবে প্রিয়ের মুখখানা আর দেখাবে না ক্লান্ত।’
‘আসলেই তুমি একটা ফাজিল।’ মিথিলা রেগেমেগে বলল।
সে বলল, ‘বুঝেছি, শ্বশুর মশাই আমাকে ফাজিল বলেছেন।’
‘সেটাও আড় পেতে শুনে ফেলেছ।’
‘না, তোমার মুখনিঃসৃত বাক্যবিন্যাসে গলদ ছিল। বুঝলাম তুমিই আমাকে একমাত্র ফাজিল বলোনি, তার আগে কেউ বলেছেন। মানে শ্বশুর মহোদয়। অতএব...।’
মিথিলা রাগ করে বলল, ‘আমার আর বাবার প্রতি তোমার মায়া নেই।’
‘আছে, দু’জনের জন্যই। মায়া তো একদিনে প্রকাশ করা যায়না। সেটা প্রকাশের জন্য আরো বহুবছর রয়েছে সামনে।’
‘ধরো আমি যদি কাল মরে যাই?’
‘আমিও তো মরতে পারি।’
‘ধরো, আমি মরলাম।’ ভাবগম্ভীর কন্ঠে মিথিলা বলল।
‘মরার প্রসঙ্গটা বাদ দাও...অন্য কথা বলো।’
‘আমি মরে যাব দেখে নিয়ো।’
‘কী মুশকিল, কেন তুমি মরতে যাবে? আত্মহত্যা করার মতো তো কোনো কারণ ঘটেনি।’
‘আত্মহত্যা আমি করব না। রোড অ্যাক্সিডেন্টে মরব আমি।’
সে ছুটে গিয়ে মিথিলার মুখে হাত রাখল। বলল, ‘এসব অলুক্ষণে কথা বলতে হয় না। মরবার কথা বলার মতো পরিস্থিতি কি সৃষ্টি হয়েছে, মিথিলা?’
মিথিলা ওর বুকে মুখ ঘঁষতে থাকল। হু হু করে কান্না জুড়ল।
সে বলল, ‘আমি যোগ দিই গিয়ে কাজে। তারপর ভেবে দেখি কী করা যায়। আমার আবার ট্রান্সফারের সময় হয়ে আসছে। এবার তদ্বির করব খুলনায় ট্রান্সফার হতে।’
চোখ মুছে মিথিলা বলল, ‘ঠিক আছে। তাহলে চলো তুমি আমি এখানেই জীবনটা গড়ে তুলি। হাঁপিয়ে উঠেছি, আর পারছিনা।’
‘দেখি কী হয়। হয়তো এখানেই থাকব।’
মিথিলা ভারি আনন্দিত হয়েছিল সেদিন। আঁধার কেটে গিয়ে তার চোখমুখ মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।

পুরনো দেয়ালে সেঁটে থাকা প্রাচীন সেওহারা টকটক করে চলেছে। সে ঘাড়ের নিচে ডাবল বালিশ দিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ছিল, টক টক শব্দ শুনছিল। অনেকক্ষণ ধরেই শায়িত সে বিছানায়। ঘরের বাতি জ্বালানো। বাতির আলো ভালো লাগছিল না; অথচ উঠে গিয়ে নেভানোর কাজটা সারতে সে কুঁড়েমি করছিল। বৃহস্পতিবার রাতে সে টিভি দেখেনা বা কোনো মুভিটুভিরও ধার ধারেনা। পরদিন অফিস বন্ধ থাকে বলে রাজ্যের আলস্য করে; আবোলতাবোল ভেবে চলে এবং বহু স্বপ্ন রচনা করে। জানালায় হামলে পড়া আম্রশাখার ফাঁকফোকর গলে নীল আকাশ দেখে। আর সন্ধ্যায় বা রাতে ট্রানজিট-যাত্রি বন্ধুর সাথে সখত্যা করে। বন্ধুটি গুরুগম্ভীর ভাবে বসে থাকে। বড় বড় দুইচোখ ঘুরায় চরকির মতো।
বড্ড গরম পড়েছে কদিন ধরে। ফুলস্পিডে ফ্যান ছেড়ে দিয়েও সে ঘরের গুমোট গরম তাড়াতে পারেনা। অনেকদিন ভেবেছে ছোটো সাইজের একটা এসি কিনবে, কিন্তু চিলেকোঠার এই প্রাচীন ঘরটাতে এসি বেমানান হবে বলে আর সেদিকে যায়নি। আরো একটা বিষয় ভেবেছে--যার বারবার বদলি হয়, তার জন্য জিনিসপত্তর বাড়ানো ঠিক না। এসির মতো ভারি বস্তু কিনে সে বোঝা বাড়াতে চায় না। তাই চিলেকোঠার ভ্যাপসা গরম সয়ে সে পার করেছে অনেকগুলো দিন। দরজা জানালা খুলে দিয়ে খালি গায়েই ঘরটায় বিচরণ করে। চিলেকোঠায় কী অবস্থায় আছে, তা দেখতে কেউ আসবে না, সুতরাং নিশ্চিন্ত মনেই সে উদোম গায়ে থাকে সে।
বন্ধের এক দুপুর বেলা। গরমের সাথে যুদ্ধ করছিল সে। হঠাৎ সশব্দে ঘরে ঢুকল তার সহকারি হাশেম শিকদার। আজদাহা এক প্যাডেস্টাল ফ্যান টেনেহিঁচড়ে ঘরের ভেতরে নিয়ে এলো। কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল, ‘এই যে স্যার, নিয়ে এলাম। এই গরমে কাজে দেবে। ঠাণ্ডা হাওয়ায় ঘুমোতে পারবেন স্যার।’
দেয়ালের হ্যাঙ্গার থেকে শার্ট টেনে নিয়ে গায়ে চড়িয়ে সে বলল, ‘এটা কোত্থেকে এলো!’
‘স্যার অফিসের স্টোরে পড়ে ছিল, অনেক ধুলা আর ঝুল জমেছিল। পরিষ্কার করে তারপর চালু করলাম। হাওয়ায় একদম উড়িয়ে নিতে চায়।’
‘অফিসের জিনিস আমার বাসায় কেন!’
থতমত খেয়ে হাশেম বলল, ‘ইয়ে, না স্যার। ভাবছিলাম, পড়েই তো আছে। যদি স্যারের উপকারে আসে।’
‘অফিসের কোনো জিনিস বাসার উপকারে আসবে না। নিয়ে যান এটা। হাশেম সাহেব, আপনি লোক ভালো, আমি জানি। তাই বেশি কিছু বললাম না।’
‘জি স্যার। সরি স্যার,’ হাশেম সাহেব যেতে উদ্যত হয়।
‘আরেকটা কথা। রশিদ সাহেবকে বলবেন স্টোরের একটা ইনভেন্টরি তৈরি করে ফেলতে। কী কী জিনিস স্টোরে আছে দেখব। আর কী কী জিনিস ছিল, এখন নেই--তারও একটি আলাদা বিবরণী আমাকে দিতে বলবেন।’
‘জি স্যার, বলব।’
‘এখন আপনি আসুন।’
‘জি স্যার, এখন আমি আসছি।’
কাশির শব্দ পাওয়া গেল। দোরগোড়ায় দেখা গেল বাড়িওয়ালা কাজেম সাহেবকে। শাদা ধবধবে চুলদাড়ির এই ছিপছিপে ভদ্রলোকের চুলদাড়ি নাকি বহুবছর যাবত এমন শুভ্র আর বহুকাল যাবতই তিনি এমন বৃদ্ধ। তিনি বললেন, ‘দেখলাম একটা ফ্যান চলে গেল...।’
‘সেকেন্ড হ্যান্ড ফ্যান। পছন্দ হয়নি বলে ফেরত পাঠালাম।’
লুঙ্গি গেঞ্জি পরা বৃদ্ধ কাঁধের গামছাটা শরীরে ঘুরাতে ঘুরাতে বললেন, ‘সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস না কেনাই ভালো, গতবছর আমি একটা টিভি কিনেছিলাম...।’
‘আপনার শরীর ভালো তো, চাচা?’
‘আর শরীর, মেয়েটাকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় থাকি। ওর একটা গতি করে যেতে পারলে...। আমার মেয়ে, ওই যে রূপসার মা। রূপসার বাবা লিভার সিরোসিসে মারা যায় দুইবছর আগে। মা-মেয়ে এখন আমার কাছে থাকে। মেয়েটা আমার বড় লক্ষ্মী, ওর কপালে আল্লাহ কেন এত দুঃখ লিখে রাখলেন...।’
বৃদ্ধ আধঘন্টা কাটালেন ওর তক্তপোষে বসে। বকবক করে গরম তাতিয়ে দিয়েছেন আরো। আকার ইঙ্গিতে আগের প্রসঙ্গ টানলেন। মাথার বারোটা বাজিয়ে দিয়ে তারপর বিদূরিত হলেন। ছিপ ফেলে দিয়ে নিদারুণ ধৈর্যসহকারে বসে আছেন বৃদ্ধ। টোপ যদি গিলে কেউ। তার টোপের লক্ষবস্তু যে চিলেকোঠার বাসিন্দা--এটা দিবালোকের মতো সত্য। রূপসাকে পঠিয়ে তারা ওর মন জয়ের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। সম্ভবত রূপসা-পর্ব শেষ হলে তারা রূপসা-মাতা পর্ব শুরু করবেন। আকার ইঙ্গিতে সে শুনেছে রূপসার মাতা নাকি অতীব রূপসী। তাদের ভাবসাব দেখে বোধ হচ্ছে যে, রূপসার সাথে খাতির পর্ব যেহেতু সমাপ্ত এবং রূপসার প্রতি যেহেতু তার পিতৃসম স্নেহ উপচে পড়ছে, সেহেতু তারা অচিরেই রূপসার মাতাকে ছাতে বিচরণ করবার নিমিত্ত অনুপতিপত্র প্রদান করবেন।

ছোটো ছোটো পদশব্দে সে টের পেল রূপসা এসেছে ছাতে। আজকাল এমন অভ্যাস হয়ে গেছে, রূপসাকে একবেলা না দেখলে তার খাবার হজম হয়না। নিউমার্কেট থেকে সে একটা বার্বি-ডল কিনেছে সেদিন। রূপসা গুটি গুটি পায়ে চিলেকোঠার কক্ষে প্রবেশ করল।
‘এই যে রূপসা এসে গেছ।’
রূপসা মাথা নাড়ল। মেয়েটা কথা কম বলে। কিন্তু চোখেমুখে অনেক কিছু সে প্রকাশ করে।
‘আম্মু ভালো আছে?’ প্রথমবারের মতো সে মেয়েটাকে মায়ের কথা শুধল।
‘ভালো আছে।’
‘তুমি পুতুল পছন্দ করো?’
‘কী পুতুল?’
‘বার্বি।’
‘করি।’
‘নেবে?’
‘না।’
‘না কেন, তুমি তো পুতুল পছন্দ করো।’
‘আম্মুকে জিজ্ঞেস করব।’
‘পুতুল নিলে আম্মু রাগ করবেনা। এই নাও, এটা পছন্দ হয়?’
‘হয়।’ ছোঁ মেরে সুদৃশ্য দামি পুতুলটা কাঁখে ফেলে এক দৌড়ে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল রূপসা।
সেদিকে তাকিয়ে হো হো করে হাসল সে। হাসির শব্দে একটা নেংটি ভয় পেয়ে তিড়িং তিড়িং করে পালাল। আকাশটা কালো হয়ে আসছে। বোধহয় বৃষ্টি হবে। বহু আকাক্সিক্ষত বৃষ্টি। এমনি এক মেঘকালো দিনে মুষলধারায় বৃষ্টি বিশ্ব চরাচর ভাসিয়ে দিচ্ছিল। সেই বৃষ্টিতে ভিজে, কাদাসিক্ত হয়ে হাসপাতালে পৌঁছেছিল সে। রক্তাক্ত বেডে মিথিলার দেহটা নিথর হয়ে পড়ে ছিল। মিথিলা! জলজ্যান্ত মিথিলা কেমন করে এমন রক্তসিক্ত হয়ে উঠল, কেন সে এভাবে বিদেয় জানাল পৃথিবীকে?
...মনে উঁকি দিল সেই ভয়াল কান্নাস্নাত দিনটি। তাই বৃষ্টির প্রতীক্ষায় তার আনন্দঘন ক্ষণটুকু মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হলো। মিথিলার এভাবে চলে যাওয়াটা আজও মেনে নিতে পারেনি তার মন। এখন মনে হয় সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে খুলনা শহরের গোয়ালঘর ও হাঁসমুরগি সমৃদ্ধ গোলপাতার ছাউনির কুটিরে সে আর মিথিলা সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারত। সে চাকরি ছেড়ে দিত, সামান্য রোজগার করে মিথিলাকে নিয়ে পর্ণকুটিরে দিব্যি কাটিয়ে দিত। মিথিলা কেন বলেছিল সে অ্যাক্সিডেন্টে মরে যাবে? সে জানত!
পার্সের ভেতরে মিথিলার ছবিটা ওকে বড্ড কষ্ট দেয়। তবু সে সেটা পকেটে ধারণ করে। ওরা সুখের সংসার পাতলে রূপসার মতো একটি মেয়ে থাকত। দুধেল গাই, হাঁসমুরগি ও সব্জিবাগান থাকত। কাজের লোক থাকত। মিথিলা আর সে হেসেখেলে বেড়াত। সেই সুখটুকু তো খুব দূরে ছিলনা। সেই তো সে ফিরে এলো খুলনায়।
শ্বশুর হঠাৎ ইন্তেকাল করলেন। মিথিলার খালা এসে বোনঝিকে ঢাকায় নিয়ে নিজের কাছে রাখলেন। ততদিনে সে বদলি হয়ে খুলনায় এসে রেস্টহাউসে উঠল। সুখবরটা দিল মিথিলাকে। মিথিলা তখনই রওনা দিতে চাইল, সে বলেছিল সে নিজে ঢাকায় গিয়ে ওকে নিয়ে আসবে। কিন্তু মিথিলা শোনেনি কারুর কথা। মিথিলা হু হু করে কাঁদছিল আর বলছিল--‘তুমি তখন রাজি হলে আজ বাবা বেঁচে থাকতেন। তোমার মানসম্মানের কিচ্ছুটি হতোনা আমাদের বাড়িতে এসে সংসার পাতলে। আমরা তো সেভাবে চিন্তা করে তোমাকে প্রস্তাব দিইনি...।’
‘ঠিক আছে, আগে আমি ঢাকায় আসি তো তোমাকে নিয়ে আসতে, তারপর যত খুশি বোকো আমাকে।’
কিন্তু শোনেনি মিথিলা। পরদিনই বাসের টিকিট কেটে একা রওনা দিল। ফুলতলার কাছাকছি এসে বাসটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। চারজন স্পট ডেড, সাতজন গুরুতর আহত হয়েছিল। এদের মধ্যে মিথিলা একজন। মিথিলা এক রাত যুঝে পরদিন ভোরে পরপারে পাড়ি দেয়। বাসের বেঁচে যাওয়া যাত্রিরা ঢাকা থেকে রওনা দেবার পর থেকে দক্ষ ড্রাইভারের প্রশংসা করছিল। এত মসৃণভাবে সে বাস চালিয়ে আসছিল যে, নিয়মিত কয়েকজন যাত্রি সেই বাস ড্রাইভারের নাম জেনে নিয়েছিল সুপারভাইজারের কাছে যাতে পরবর্তীতে তাদের যাতায়াতের সময় তারা যেন এই ড্রাইভারের নির্ধারিত বাসটায় উঠতে পারে।
পারিবারিক কবরস্থানে বাবা ও মা’র কবরের পাশে চিরশায়িত হলো তাঁদের মেয়ে--তার সহধর্মিনী, তার মিথিলা। কবরস্থানে সে একদিনই গিয়েছিল; যেদিন মিথিলা চিরশয্যা পেতেছিল। আর যায়নি সে ভেতরটা টনটনিয়ে ওঠে বলে। এরপর সে রেস্টহাউসের কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ ছেড়ে উঠল নিরিবিলি এক চিলেকোঠায়।

রূপসা ওর মেয়ে হলে কেমন হয়? ভারি মজার হয়। কন্যার মর্যাদা পাবার মতোই নিষ্পাপ-মিষ্টি মেয়ে রূপসা। ভেতরটা নাড়িয়ে দেয়। সে রূপসার বাবা, কিন্তু ওর মা? অধুনা রূপসার মা ছাতে এসে হাঁটাহাঁটি শুরু করেছে। সন্ধ্যার প্রাক্কালে পদশব্দটা এখন নিয়মিত পাওয়া যায়...।
***
‘তোমার লজ্জা হওয়া উচিৎ।’
চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে মাকড়শাটাকে দেখতে পেল সে। ভূতুড়ে চোখ মেলে ওর দিকে চেয়ে আছে। আগের চেয়ে আকারে অনেক বড়। কালো রোমশ শরীর। বাথরুমের ঝুরঝুরে দেয়াল আঁকড়ে বসে আছে। কন্ঠটা ফের বলে উঠল, ‘নিজকে তুমি যতই সাধু মনে করো না কেন, তুমি আসলে কপট।’
‘না,’ সে বলে উঠল, ‘কেন আমি কপট হবো?’
‘কপট লোকেরা এমনি করেই সাফাই গায়,’ কন্ঠটা বলল, ‘তুমি একগুঁয়ে। নিজ স্বার্থটাই বড় করে দেখেছ তুমি। ইচ্ছে করলেই তুমি এড়াতে পারতে নাটকের এমন বিয়োগান্তক পরিণতি।’
‘এরকম নাটক তো আমি লিখিনি!’
‘কে বলল তুমি লেখনি। এখনও লিখে চলেছ। একটা ফ্যান ফেরত দিয়ে সাধু সাজছো। ভাবছো তোমার সব কালিমা মুছে যাবে তোমার লোক দেখানো সাধুগিরির আড়ালে।’
‘এসব কী কথা!’ সে বলে উঠল।
‘তোমার অহংকার। শ্বশুরকে তুমি তোয়াক্কা করোনি। স্ত্রীকে তুমি মনে করেছিলে খেলার পুতুল।’
ছিটকে বেরিয়ে আসে সে বাথরুম থেকে। দরদর করে ঘামতে থাকে। তার শখের সেওহারা নিরালা দুপুরে কটাকট শব্দে ব্যঙ্গের হাসি ছুড়ে দিল তার দিকে। ‘ঠিক-ঠিক-ঠিক’ বলে সেওহারাকে সমর্থন দিল একটা টিকটিকি।
গায়ের গেঞ্জি খুলে ছুড়ে ফেলে হাত পাখাটা টেনে নেয় সে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল জমাট বাঁধা রক্ত। আতঙ্কের চিৎকার বেরিয়ে আসে তার কন্ঠ চিরে। মিথিলা নামের এক নিরাকার নারীর অবয়ব দুলে ওঠে চোখের সামনে।

সন্ধ্যার প্রাক্কালে সে প্রায় নিয়মিত পদশব্দটা পায়। শরীর শিরশিরিয়ে ওঠে। একজন জোয়ান, সুন্দরী মহিলার এতটা বেহায়া হওয়াটা কি সাজে? এটা কেমন প্রলোভন! আজকাল অবসাদ ভর করছে শরীরে। বহুদিন সে ছাতের ক্যাকটাসের পরিচর্যা করেনি। কাজেকর্মে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। গত কিছুদিন তার কাজকর্মের ব্যত্যয় হচ্ছে।
এক সন্ধ্যেয় পদশব্দ পেয়ে মনস্থ করল রূপসার মায়ের মুখোমুখি হবে। এরকম ভৌতিক আয়োজন কেন? তার যদি বিয়ে করার প্রবল বাসনা জেগে থাকে, তবে সে সোজাসাপ্টা প্রস্তাব পাঠালেই তো পারে। সে দুরুদুরু বুকে ছাতের দিকে এগুলো।
আছে। মহিলা তার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে ছাতে নুয়ে পড়া একটা নারকেল পাতা ঘেঁষে। চুল ছড়িয়ে আছে তার পিঠ ও কোমরজুড়ে। তার উপস্থিতি ঠাওর করে মহিলা ফিরল তার দিকে। তার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে এলো শীতল স্রোত। সে কয়েক কদম পিছু হাঁটল। তারপর আচমকা ঘুরে তীরের বেগে ছুটে এলো নিজ কক্ষে। দরজা বন্ধ করে সে হাঁপাতে থাকে। নারকেলের পাতার আড়ালে লম্বাচুলো মিথিলা দাঁড়িয়ে ছিল!
পরের কয়েকটি দিন সে নিস্তেজ মন নিয়ে কাটিয়ে দিয়ে একদিন সকালে হঠাৎ চাঙ্গা বোধ করল। সে সিদ্ধান্ত নেয়, জোর তদ্বির করে অন্যত্র বদলি হয়ে যাবে আবার। চিরবিদায় নেবে তার পোকামাকড়-নেংটি-চামচিকে-পেঁচা ও সরীসৃপ বন্ধুদের কাছ থেকে।

কথামালা Designed by Templateism | Blogger Templates Copyright © 2014

Theme images by mammuth. Powered by Blogger.