Stories

ডাইনি -

আতঙ্কের ব্যাপারটা যে সত্যি সত্যি ঘটে গেছে, সে সম্বন্ধে নিশ্চিত হতেই ভয়ের একটা হিমস্রোত তানিশার মেরুদণ্ড বেয়ে সোজা নিচের দিকে নেমে এল। নির্ধারিত সময়ের দিন সাতেক পরেই প্রথম ওর মনে এ নিয়ে খটকা বেধেছিল। সাত দিন চলে যাচ্ছে, কিন্তু...। তবু ব্যাপারটাকে তখনো ও ততটা গুরুত্ব দেয়নি। এমন তো অনেকবারই হয়েছে। সাত দিন কেন, পনেরো-ষোলো, এমনকি একবার আঠারো দিন পরেও হয়েছিল। এই
সামান্য দেরিতে কী এসে–যায়। কিন্তু দ্বিতীয় সপ্তাহ পার হলে ওর কপালে কিছুটা দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল। তবু নিজেকে ও এ বলে বুঝ দিল যে নানা শারীরিক কারণে অনেক সময় দুই সপ্তাহও পার হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটা সত্যি সত্যি বিপদ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল তিন হয়ে চার সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পর। না, আর তো কোনো যুক্তিই টেকে না। বিশেষ করে তখন চার সপ্তাহ আগে আবরারের সঙ্গে যখন তার শেষ দিনের সম্পর্কটি ঘটেছিল পুরো অরক্ষিত অবস্থায়। কাজেই দ্বিতীয়-তৃতীয় সপ্তাহের পর থেকে তার মনে যে দুর্ভাবনা পাথরের মতো ভারী হয়ে চেপে বসছিল, ছয় সপ্তাহ পার হলে তা যেন একটা মূর্তিমান দুঃস্বপ্ন হয়ে তার বুকের ওপর চেপে বসল। ছয় সপ্তাহ পার হবার পর ডাক্তারের কাছে গিয়ে তানিশা ও আবরার নিশ্চিত হলো যে তানিশা অন্তঃসত্ত্বা।
বিবাহিত মেয়েদের অন্তঃসত্ত্বা হওয়া এমন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু সমস্যা তানিশার স্বামী সাব্বিরকে নিয়ে। গত বছর তাদের প্রথম সপ্তানের জন্মের পর সে ধনুকভাঙা পণ করেছে যে পাঁচ বছরের মধ্যে সে কিছুতেই সন্তান নেবে না। তার ধারণা, দুই সন্তানের মধ্যে অন্তত বছর পাঁচেকের একটা ব্যবধান থাকা ভালো। তা নাকি সন্তানদের সুস্থ মানসিক বিকাশে সাহায্য করে। তার ধারণা, বয়সের এই পার্থক্যের ফলে ছোট সন্তানের জন্য বড়জনের মধ্যে একধরনের দায়িত্ব ও মমতাবোধ তৈরি হয়। এতে তাদের সম্পর্ক যেমন হয় নিবিড়, তেমনি পরস্পরনির্ভরশীল। সাব্বির একটা বইয়ে এ সম্বন্ধে পড়ে ও ওর একজন চাচাতো ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বয়সের পার্থক্যের এ ব্যাপারটি দেখে এই সিদ্ধান্ত এসেছে। না, কেবল আসেনি, ধারণাটা ওর মনে রীতিমতো বদ্ধমূল হয়ে গেছে।
সাব্বির একরোখা স্বভাবের মানুষ। কোনো কিছু একবার ঠিক করে বসলে তা থেকে তাকে সরানো অসম্ভব। কিন্তু সন্তানদের বয়সের পার্থক্য সম্বন্ধে তানিশার ধারণা ভিন্ন। ওর মত হলো, দুই সন্তানের প্ল্যান থাকলে তা পরপর হয়ে যাওয়াই ভালো। এতে প্রথম দু-চার বছর বাবা-মায়ের ওপরে কিছুটা বাড়তি ঝামেলা পড়লেও ওরা একটু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাপ-মা ঝামেলামুক্ত হয়ে যায়। যা হোক এ নিয়ে তাদের মধ্যে বচসা আর ঝগড়াঝাঁটি কম হয়নি। কিন্তু শেষ অব্দি সাব্বির পুরো গোঁ ধরায় তানিশাকে সাব্বিরের ব্যবস্থাটাই মেনে নিতে হয়েছে। তানিশা মেনে নিয়েছে, কিন্তু ওর হাবভাব দেখে ওর ওপর সাব্বিরের পুরো আস্থা আসেনি। সাব্বিরের আশঙ্কা যেকোনো মুহূর্তে সন্তান প্রতিরোধব্যবস্থায় ও ঢিলে দিয়ে বসতে পারে, তাই এ দায়িত্বের পুরোটাই ও নিজের ওপর নিয়ে নিয়েছে। আর যা–ই হোক অন্তত কারও কোনো ভুল বা গাফিলতির জন্য যেন এ ধরনের কোনো উটকো ঘটনা না ঘটে, তাই নিয়ে সে যেমন উদ্বিগ্ন, তেমনি সতর্ক। কাজেই আচমকা তানিশার এভাবে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ব্যাপারে সাব্বিরের কাছে এখন তানিশার ব্যাখ্যা কী? একটা অভূত ভয় ওকে ঘিরে ধরে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে।
সন্দেহ নেই যে, যে সন্তানটিকে এই মুহূর্তে সে লালন করছে আসলে সে আবরারের। দূর ভবিষ্যতে কোনো দিন সন্দেহ করে সাব্বির যদি সন্তানটির ডিএনএ টেস্ট করে, তবে সঙ্গে সঙ্গেই ধরা পড়ে যাবে গোমরটা। কিন্তু তানিশা জানে চরম সন্দেহজনক কিছু হাতে না এলে এমন কিছু ঘটবে না। কিন্তু সন্দেহের প্রমাণ তো আজ সাব্বিরের হাতের মুঠোয়।
সাব্বিরের মন এমনিতে সন্দেহপ্রবণ নয়। সংসার, স্ত্রী আর বাচ্চাকাচ্চার এই ছোট্ট ঘের-দেওয়া জায়গাটুকুই তার জীবনের মক্কা। এই একরত্তি সবুজ পৃথিবীর অল্প কটা মানুষকে ভালোবেসে আর বিশ্বাস করে সে তার নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কাটাতে চায়। হুজ্জত, ঝামেলা, প্রশ্ন-অবিশ্বাস এসব নিয়ে উথালপাতাল হতে হলে ও হাঁফিয়ে ওঠে, ভেঙে পড়ে। কিন্তু এবার সে ভারসাম্য কতটুকু টিকবে?


২.

তানিশার চাওয়া-পাওয়া, শৈশব-কৈশোরের গল্প, গত সাতাশ বছরের ইতিহাস-ভূগোল সবই প্রায় সাব্বিরের উল্টো। ছোট পরিবেশ বা নির্জলা স্বস্তি ওকে প্রায় অসুস্থ করে তোলে। তানিশার বাবা-মা একেবারেই সাদামাটা গোবেচারা মানুষ। সারা জীবন দুজন দুজনার প্রতি অনুগত থেকে পরস্পরকে ভালোবেসে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। এমন নিরীহ বাবা-মার রক্তের ধারায় এমন আগুনের স্ফুলিঙ্গ কী করে জন্মাল, তা নিয়ে তানিশা নিজেও ভেবেছে। হয়তো পিতা-মাতার কাছ থেকে নয়, দূর অতীতের কোনো অচেনা পূর্বপুরুষ বা আদিম মাতৃকার জ্বলন্ত রক্তকণা থেকে তার ভেতর এ আগুন নেমে এসেছে।
যা ওকে সারাক্ষণ টানে তা হলো, জীবনের বহুমুখী স্বাদ ও নতুনত্বের আকর্ষণ; বিশেষ করে পুরুষ মানুষের ব্যাপারে। কলেজজীবন পার হওয়ার আগেই সে টের পেয়ে গিয়েছিল যে কোনো পুরুষের মধ্যে আলাদা বা জ্বলজ্বলে কিছু দেখলেই সে তার ব্যাপারে অদ্ভুতভাবে অসহায় হয়ে পড়ে, তা সে মানুষটি স্বর্গীয়, আদিম, জান্তব যা–ই হোক। এ দুর্বলতার কোনো ব্যাখ্যা সে দিতে পারে না। এরপর সে কেবল টের পায় নিজের অজান্তে, পায়ে–পায়ে সে সেই অনিবার্য নিয়তির দিকে অন্ধের মতো হেঁটে যাচ্ছে। কিন্তু স্বস্তির কথা অবস্থাটা চলে অল্প দিনের জন্য। ওই স্বাদ একবার জানা হওয়ামাত্র অদ্ভুতভাবে সে ওই মানুষটির মদির আকর্ষণ থেকে অব্যাহতি পেয়ে যায়। মানুষটি তখন শীতের পাতার মতো কুঁকড়ে মিইয়ে তার পায়ের কাছে পড়ে থাকে। তার সহজাত প্রকৃতি তাই তাকে আজ পর্যন্ত কারও ব্যাপারে পুরো অনুগত বা সুস্থির—কোনোটাই হতে দেয়নি।

৩.
ওর স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক, ও নিজেও একটা মোবাইল ফোন কোম্পানিতে চাকরি করে। ওর জন্য স্বামীর ভালোবাসাও খাদহীন। স্বামীকে সে কিছুটা পছন্দও করে, কিন্তু মানুষটা নেহাতই যেন ফাঁপা হাঁড়ি। জীবন্ত মানুষের কোনো অনুভূতিই যেন নেই তার মধ্যে। তানিশার পিপাসা চোখ হয়তো আজও তাই জোছনা অরণ্যের কামান্ধ চিতার মতো কারও জীবন্ত পায়ের ছাপ অনুসরণ করে ঘুরে বেড়ায়।
তানিশা গতানুগতিক সুন্দরী নয়। যা দিয়ে পুরুষের কাছ থেকে সাফল্য সে আদায় করে তা তার মোহময় দেহবল্লরী। তার শরীরের বাঁকে বাঁকে রয়েছে কামনার বিদ্যুৎবহ্নি—যা পুরুষ-হৃদয়কে কাঁদায়, দাহ দেয়। খবরটা সে ভালো করেই জানে। তাই কচি কচি রক্তমাখা তরুণ হৃদয়ের ওপর দিয়ে ছোট্ট সুন্দর পা ফেলে হেঁটে যেতে কোনো বিকারে ভোগে না। এর আগে এমনি আরও দুজন মানুষ তার জীবনে এসেছে। কিন্তু কারও সঙ্গেই ওর সম্পর্ক দু–চার মাসের বেশি টেকেনি। কিছুদিন যেতে না যেতেই সেই পুরুষ শরীরের জান্তব গন্ধ তাকে ক্লান্ত করে তুলেছে। নানা অসুবিধা আর বিপদের বাহানা তুলে একটু একটু করে সরে এসেছে সে। প্রথম যে পুরুষটি তাকে এমনি জান্তবভাবে ডাক দিয়েছিল, সে জাতীয় ক্রিকেট দলের একজন সাড়াজাগানো খেলোয়াড়। ঘটনাটা তার বিয়ের আগের। তানিশার বয়স তখন সবে বিশ। কাঁচা জীবন তখনো যৌবনের বুনো গন্ধে ভরা। সে বুঝতে পারেনি কেন খেলোয়াড়টি তাকে অমন চুম্বকের মতো টেনেছিল। শুধু নিয়তি নির্ধারিতের মতো তার দিকে সে এগিয়ে গেছে। শুধু টের পেয়েছে একদিকে মানুষটির তারকাখ্যাতি, অন্যদিকে দীর্ঘ বলিষ্ঠ শরীরের গন্ধ আর বেপরোয়া বাসনা যেন প্রায় শেকল পরিয়ে তাকে দুই বাহুর ভেতর টেনে নিয়েছে। কিন্তু মাস তিনেক যেতে না যেতেই এমন আদিম আকুতিও ফিকে হয়ে উঠল। সে টের পেল খেলার মাঠের এই চৌকস, ক্ষিপ্র খেলোয়াড়টি জীবনের সূক্ষ্ম অলীক আর গভীর জায়গাগুলোয় কী হাস্যকর রকমের ফাঁপা।
বিয়ের পর প্রথম যার আকর্ষণে সে আবার মরিয়া হয়ে উঠল, সে সেনাবাহিনীর নতুন পদোন্নতি পাওয়া এক চৌকস মেজর। একবার অফিসের ট্যুরের অছিলা ধরে তার সঙ্গে রাঙামাটি গিয়ে কাটিয়ে এসেছিলও দিন কয়েক। কিন্তু এবারেও আত্মবিশ্বাসে ভরা এই উজ্জ্বল মানুষটির ব্যাপারে শীতল হয়ে পড়তে তার মাস তিনেকের বেশি লাগল না। না, একেবারে ছোবড়ার মতো শুকনো। কিচ্ছু নেই ভেতরে। জীবনের শুরুতেই নিজের এই অদ্ভুত চরিত্রটি দেখে চিন্তিত হয়ে পড়েছিল সে। কেন কোনো কিছুই তাকে বেশিদিন ধরে রাখতে পারে না। কী চায় সে একজন পুরুষের কাছে। সত্যি কী চায়? অন্যদের সঙ্গেও কি এমনটাই ঘটবে, সে কি নিজের মধ্যে মরে যাবে, না অন্যেরা তার কাছে ফুরিয়ে যাবে।
কিন্তু এই আবরার মানুষটা যেন তার সমস্ত বুদ্ধিকে বোকা বানিয়ে ফেলেছে। ওদের মোবাইল ফোন কোম্পানিটায় ও নিজে কাজ করে জনসংযোগ শাখায়, আবরার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। বছর দেড়েক হলো ওদের পরিচয়। চমৎকার রবীন্দ্রসংগীত গায়। বছরখানেক আগে ওদের এক বন্ধুর বাসার ছাদের ছোট্ট ঘরোয়া অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে জোছনারাতটাকে যেন পুরো সোনালি করে তুলেছিল। আবরারের সেদিনের সে গান তানিশাকে চন্দ্রাহত করে দিয়েছিল। সে রাত থেকেই মানুষটার ভেতরকার জোছনাধারাকে স্পর্শ করার জন্য একটা বিনিদ্র তাগিদ ওকে যেন মরিয়া করে রেখেছে।
আবরার ধানমন্ডি এলাকার অভিজাত পরিবারের ছেলে। থাকে শান্তিনগর এলাকায় ফ্ল্যাট নিয়ে। গত এক বছরে সেই ফ্ল্যাটেই ওরা অনেকবার ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ নিয়েছে।
কিন্তু আবরারের বিস্ময় তানিশা যেন কিছুতেই শেষ করতে পারে না। বরং টের পায় দিনের পর দিন ওর কাছে মানুষটা আরও অচেনা আর দুর্ভেদ্য হয়ে উঠছে। আবরার কোনো কিছু চাইলে তা না দেওয়ার শক্তিই যেন ওর ভেতর নেই। প্রতিটি দিনের সান্নিধ্যের পর তিন-চার দিন পর্যন্ত যেন এক অদ্ভুত সুখের ঘোরে কাটে ওর। মনে হয় ওই মানুষটার সজীব মিষ্টি অস্তিত্ব সারাক্ষণ যেন ওকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।
ওদের শেষ দিনের বিশেষ মুহূর্তটি মনে পড়ছে। অফিস পালিয়ে দুজন চলে এসেছিল আবরারের ফ্ল্যাটে। আহ, কী স্বপ্নে ভরা মিষ্টি মুহূর্ত। আচ্ছা, এর চেয়ে অপার্থিব কিছু মানুষ কি জীবনে পায়। আচ্ছা সেদিন ও কেন সতর্ক হলো না? এসব ব্যাপার এতভাবে জানা–বোঝার পর ওর তো পরিণামটা বোঝা উচিত ছিল। তাহলে কি শরীর-মনের আনন্দের অতিরিক্ত কিছু চেয়েছিল আবরারের কাছে? আরও দীর্ঘমেয়াদি আর গভীরতর কিছু? তা ছাড়া কী করবেই বা সে? প্রায় বুনো আবেগে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আবরার ওকে যে পুরো তছনছ করে ফেলেছিল।
সেই অপার্থিব মুহূর্তটা কাল সাপের মতো ভয়াল ফণা তুলে এখন দাঁড়িয়ে আছে সামনে। বিরক্তিতে আশঙ্কায় ওর ভুরু কুঁচকে ওঠে।
আচ্ছা, আমি না হয় অসতর্ক ছিলাম। কিন্তু ও তো সতর্ক হতে পারত। ও কেন পাগলের মতো করল। আমিও তো ওকে সতর্ক হতে বাধ্য করতে পারতাম। কেন করিনি? আমিও কি ওর মতোই শিশিরের মতো গলে গিয়েছিলাম? মরে গিয়েছিলাম?
ডান হাতের নরম দীর্ঘ আঙুল চুলের ভেতর চালিয়ে নিজের মনকে কিছুটা সংযত করে ও।
এ যুগে এসব উটকো ঝামেলা সামাল দেওয়া আবার একটা ব্যাপার নাকি?—মনে মনে ভাবল তানিশা। দেরি না করে গাইনির কোনো ভালো ডাক্তারের কাছে গেলেই তো সুরাহা হয়ে যাবে। কিন্তু কোন ডাক্তারের কাছে যাবে ও? ওর ছেলে অমিতের জন্ম হয়েছিল ড. জরিনের হাতে। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক। চাইলে তাঁর কাছেও যাওয়া যায়। কিন্তু অমিত হওয়ার সময় প্রতিবারই ওরা স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে গেছে তাঁর কাছে। দুজনকেই ভালো করে চেনেন তিনি। সাব্বিরের এক বড়লোক আত্মীয়েরও তিনি পরিচিত। তাঁর কাছে একা গিয়ে কী করে এমন প্রস্তাব দেবে।
ওর ভেতরের মন হঠাৎ যেন অসুস্থ হয়ে উঠল।
ড. জরিন না হলে আর কারও কাছে তো যেতে পারে? কিন্তু এই ব্যাপারের আর কোনো ডাক্তারকে তো ও চেনে না। চিনতে চাইলে অন্তত কাউকে না কাউকে তো জিজ্ঞেস করতে হবে। একজন বলতে না পারলে পাঁচজনকে জিজ্ঞেস করতে হবে। কিন্তু কেউ যদি কিছু একটা সন্দেহ করে বসে? কারও কাছে ফাঁস করে দেয়? যদি অনেকের মধ্যে জানাজানি হয়ে যায়? কথাবার্তা শুরু হয়?
ওর মনে হয় সারা পৃথিবী চারদিক থেকে ওর দিকে তাকিয়ে হি হি করে হাসছে।
তা ছাড়া ডাক্তার নাহয় পাওয়া গেল। কিন্তু তার চেম্বারে একদঙ্গল রোগীর সঙ্গে যে অন্তত দুটো দিন দু-তিন ঘণ্টা করে বসে থাকতে হবে, তখনই যে কথায় কথায় ব্যাপারটা অন্য কেউ আঁচ করবে না, তার নিশ্চয়তা কী? অপরাধ এড়ানো এত সোজা নয়। তা ছাড়া পরিচিত কেউ যদি দেখে ফেলে, কাছে এসে আসল সমস্যা নিয়ে কথা শুরু করে। যদি ডাক্তারের চেম্বারে ওর যাওয়ার কথা সাব্বিরের কোনো আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের কাছে কোনোভাবে গিয়ে পৌঁছায়! নাহ তানিশা আর ভাবতে পারে না। অস্থিরতায় শরীর ঘেমে ওঠে। সবকিছু তালগোল পাকায়।


৪.

ব্যাপারটা আন্দাজ করার সপ্তাহখানেকের মাথায় তানিশা আবরারকে পরিস্থিতিটা খুলে বলেছিল। দুশ্চিন্তায় ওর মাথার শিরা তখন দপদপ করছে। কথাটা শুনে আবরারের মুখ হঠাৎ কাগজের মতো সাদা হয়ে গিয়েছিল। ব্যাপারটা নিয়ে তার আশঙ্কা থাকলেও তা যে ঘাতকের মতো এত চটজলদি বুকের ওপর চেপে বসবে, তা ও ভাবেনি। উৎকণ্ঠা আর ভয় নিয়ে বলল, বলো কী। এখন? ওর মুখ পুরো ফ্যাকাশে।
হঠাৎ বিদ্যুতের রেখার মতো একটা আশার পথ খোলে যেন তানিশার সামনে। হ্যাঁ, যেমন করেই হোক এক বা দুই সপ্তাহের মধ্যে এভাবে একটা বিহিত করতেই হবে। যেভাবে, যেমন করে হোক, করতেই হবে সেটা। ও ছাড়া বাঁচার পথ নেই। ওর সমস্ত জেদ যেন এখন মরিয়া।
আপাতত পরিকল্পনাটা আবরারকে বলা নিরর্থক। সবকিছু ঠিকমতো না এগোলে বলে কী হবে। কিন্তু এটা কি আদৌ সম্ভব? ভাবে তানিশা। সাব্বির সাদাসিধা মানুষ, আর ওরকম বলেই না যত সমস্যা। একবার কোনো কিছু নিয়ে গোঁ ধরলে তাকে আর তা থেকে তো সরানো যায় না।
সেদিন থেকে দেখা গেল তানিশার পুরো নতুন চেহারা। সাব্বিরের সঙ্গে কয়েক দিন ধরে যুক্তি-তর্ক, অনুরোধ-উপরোধের এক অন্তহীন পর্ব। সে যুক্তির মূল কথা:
ও ভালো কেরিয়ার করতে চায়। এ জন্য এখনই ‘বাবু-পর্ব’ শেষ করা দরকার। তাতে কেরিয়ারের প্রথম দিকে কিছুটা কষ্ট হলেও চাকরির ওপরের দিকে ফ্রি হয়ে নিশ্চিত মনে কেরিয়ারে সময় দিতে পারবে। পাঁচ বছর পর আবার বাচ্চা নিতে গেলে সারা জীবন ছেলেমেয়ে মানুষ করাতেই শেষ হবে। সাধারণ মানুষদের মতো তুচ্ছ পরিচয় নিয়ে ও পৃথিবী থেকে মুছে যেতে চায় না। জীবনে ও উন্নতি চায়। খ্যাতি, সম্মান, মর্যাদা চায়। আর বাচ্চা হলেও তাকে মানুষ করার ঝক্কি তো আর সাব্বিরকে সামলাতে হবে না। এ তো মা হিসেবে তানিশাই দেখবে। তাহলে সাব্বিরের অসুবিধা কী? ওর জীবনের এই সম্ভাবনার মূল্য সাব্বির না দিলে আর কে দেবে? তাহলে এখন বাবু হতে বাধা কোথায়!
কিন্তু সাব্বিরের সঙ্গে পরপর তিন দিন তুলকালাম ব্যর্থ কথা-কাটাকাটির পর ও একসময় পুরো নীরব হয়ে গেল। তার জায়গায় শুরু হলো একটানা কান্না। সাব্বির দেখতে পেল তানিশা বিছানায় অন্যদিকে ফিরে সারা রাত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সে কান্নার যেন শেষ নেই। গোঁয়ার সাব্বির তখনো গোঁ ধরে আছে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছেলেখেলা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু দ্বিতীয় রাতেও ওকে একইভাবে কাঁদতে দেখে সাব্বির কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ল। একজন মানুষকে এভাবে কাঁদতে দেখলে কাঁহাতক সহ্য করা যায়? তৃতীয় রাত পেরিয়ে চতুর্থ রাত এলে ও একেবারে যেন ভেঙে পড়ল। ‘না, এত ছোট্ট একটা ব্যাপার নিয়ে এভাবে পারিবারিক কলহ বাধিয়ে রাখা উচিত নয়, এর শেষ করতে হবে।’ মনে মনে বলল ও।
রাত বারোটার দিকে তানিশাকে বুকের ভেতর টেনে নিয়ে সাব্বির বলল, ঠিক আছে, তোমার কথাই রাখছি।
পরের সন্ধ্যায় আবরারের বাসায় হঠাৎ হাজির তানিশা। প্ল্যানটার কথা এর মধ্যে আরবারকেও জানিয়ে রেখেছিল। দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে আবরার, ওর চোখে-মুখে উৎকণ্ঠা আর আশঙ্কা। বিজয়ীর ভঙ্গিতে তানিশা বিদেশি কায়দায় ডান হাতের বুড়ো আঙুল ওর দিকে অর্থপূর্ণভাবে উঁচিয়েই চোখ মেরে প্রতীক্ষারতা রমণীর আহ্বান নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
‘হুররা’ বলে খুশিতে পাগলের মতো ছুটে গিয়ে আবরার তানিশাকে কোলে তুলে নিয়ে শোবার ঘরে ঢুকে বিছানার ওপর মেলে দিল। খিলখিল করে কুটিল হেসে তানিশা বলল, ভয়ের দিন গেছে। তোমার বাবু এখন সাব্বিরের।
———
সচিত্রকরণ : মাসুক হেলাল

কথামালা Designed by Templateism | Blogger Templates Copyright © 2014

Theme images by mammuth. Powered by Blogger.